
জি এম নজরুল ইসলাম: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনঘেঁষা ১২ নম্বর গাবুরা ইউনিয়নে সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, বনদস্যুদের সঙ্গে যোগসাজশ, জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ে সহযোগিতা এবং সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে হয়রানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষা গাবুরা ইউনিয়নের মানুষের জীবন ও জীবিকা দীর্ঘদিন ধরেই এই বনকে ঘিরে আবর্তিত। জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত সুন্দরবনে ছুটে যান জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা। কিন্তু জীবিকার এই কঠিন পথেও যদি ভয়, হয়রানি ও অর্থ আদায়ের মতো অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে তা শুধু ব্যক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করে না যেসুন্দরবননির্ভর একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সুন্দরবননির্ভর মানুষের অসহায়ত্ব ও জীবিকার ওপর নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায় করে আসছে। মানববন্ধনে মেহেদী হাসান, গাবুরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জি.এম. বিল্লাল হোসেন এবং ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জি.এম. ইয়াসিন আরাফাতের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন স্থানীয়রা।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন আজমুন্নাহার, রওসানআরা বেগম, সালাউদ্দিন আহমেদ, জনাব আলিসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। বক্তারা বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষ প্রতিকূল প্রকৃতি, জলদস্যু-বনদস্যুর আতঙ্ক ও জীবিকার অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে জীবনধারণ করেন। তাদের কষ্টার্জিত অর্থ যদি কোনো প্রভাবশালী মহলের চাঁদাবাজি কিংবা অবৈধ অর্থ আদায়ের শিকার হয়, তাহলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
বক্তাদের অভিযোগ, সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ আদায় করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, আদায় করা অর্থের একটি অংশ বনদস্যুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করেন তারা।
এ সময় বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো ব্যক্তি এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। সুন্দরবনে যাওয়া বনজীবীদের নানাভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও উঠে আসে মানববন্ধনে।
মানববন্ধনে বিশেষভাবে মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে হয়রানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়। বক্তাদের দাবি, তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলায় পলাতক আসামি থাকার বিষয়টিও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য জানা যায়নি।
এ-সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের নাম ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে মানববন্ধনে জানানো হয়। অভিযোগে দাবি করা হয়, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তাকে শ্যামনগর এলাকায় আটক করে থানায় সোপর্দ করা হয়। পরদিন শ্যামনগর থানায় মামলা নং-২০, পেনাল কোডের ৩৬৫/৩৮৬ ধারায় মামলা করা হয় এবং পরে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
বক্তারা বলেন, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এই অঞ্চলের হাজারো মানুষের কাছে সুন্দরবন তাদের জীবন, জীবিকা ও বেঁচে থাকার অবলম্বন। নদী-খাল, কেওড়া-গরান আর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করে যারা প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে বনে যান, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি তাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অর্থ আদায়, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা হয়রানি করে থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা প্রশাসনের প্রতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
পাশাপাশি সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের নির্বিঘ্নে জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ সৃষ্টি এবং বনজীবীদের ওপর যেকোনো ধরনের অবৈধ অর্থ আদায় ও হয়রানি বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি কামনা করেন বক্তারা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয়রা বলেন, সুন্দরবনের বুক চিরে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া সাধারণ মানুষের চোখে এখন নতুন করে নিরাপত্তার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের প্রত্যাশা—অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের চোখে না দেখে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে এবং সত্যতা প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে নির্দোষ ব্যক্তিরাও যেন হয়রানির শিকার না হন—এ বিষয়েও প্রশাসনের সজাগ থাকার আহ্বান জানানো হয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে সুন্দরবননির্ভর মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরে আসবে এবং সুন্দরবনের সম্পদ ও জীবিকার ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো ভয় ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশে তাদের জীবন-জীবিকা পরিচালনা করতে পারবেন।

