
জি এম নজরুল ইসলাম, নিজস্ব থেকে: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসনের করুণ বাস্তবতা নিয়ে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক একটি বইয়ে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে নাম উঠে এসেছে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সাংবাদিক জি এম মাছুম বিল্লাহর।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষা জনপদের মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও জলবায়ু সংকটের বাস্তবচিত্র আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার নেপথ্য সহায়তাকারী হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করায় উপকূলীয় সাংবাদিকতায় যুক্তদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি।
যুক্তরাষ্ট্রের The New Press থেকে গত ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত Shelter from the Storm: How Climate Change Is Creating a New Era of Migration বইটির লেখক মার্কিন সাংবাদিক ও মাইগ্রেশন গবেষক জুলিয়ান হ্যাটেম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের জীবন, জীবিকা ও বসতভিটায় যে গভীর সংকট তৈরি হচ্ছে, বইটিতে তার বাস্তব ও মানবিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বইটির কৃতজ্ঞতা অংশে লেখক মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, ফিক্সিং, অনুবাদ এবং স্থানীয় বাস্তবতা বুঝতে সহায়তাকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। সেখানে রিটন কুইয়া, অ্যালেন ডায়াস, জি এম মাছুম বিল্লাহ, বেলাল উদ্দিন জয়সহ আরও অনেকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একজন আন্তর্জাতিক লেখকের গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থে শ্যামনগরের এই সাংবাদিকের নাম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্থান পাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতা ও মানুষের পাশে থেকে কাজ করার একটি স্বীকৃতি।
সুন্দরবন শুধু একটি বন নয় এটি উপকূলের মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য প্রাকৃতিক আশ্রয়। এই সুন্দরবনের প্রান্তিক জনপদ শ্যামনগর দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন অভিঘাত বহন করে চলেছে। লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, পানির সংকট ও জীবিকার অনিশ্চয়তা এখানকার মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার কাছাকাছি থেকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন সাংবাদিক জি এম মাছুম বিল্লাহ।
বইটিতে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন ও সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও ভাঙন কেড়ে নিচ্ছে মানুষের বসতভিটা, কোথাও সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নষ্ট করছে কৃষিজমি, আবার কোথাও জীবিকার সন্ধানে মানুষকে ছুটতে হচ্ছে এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে। এই বৈশ্বিক সংকটের মানবিক দিকটিই বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বইটিতে নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় এক কোটি মানুষকে জলবায়ু অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করার প্রসঙ্গও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক ও স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুন্দরবন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জি এম মাছুম বিল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন ও উপকূলীয় জনপদের মানুষের জীবন, জীবিকা, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নানা সংকট নিয়ে কাজ করে আসছেন। তাঁর সাংবাদিকতার পরিধি শুধু সংবাদ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশ-বিদেশের গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে উপকূলের মানুষের বাস্তব জীবন ও প্রকৃতির পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরতেও তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন।
জানা যায়, তিনি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ৩৩টি গণমাধ্যম এবং বেশ কয়েকজন গবেষককে সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধানমূলক কাজের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, স্থানীয় বাস্তবতা বুঝতে সহায়তা করা এবং মাঠের তথ্য আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও গবেষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
একজন স্থানীয় সাংবাদিকের কাজ অনেক সময় কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর সংগ্রহ করা একটি তথ্য, তাঁর দেখিয়ে দেওয়া একটি নদীভাঙনের জনপদ, তাঁর পরিচয় করিয়ে দেওয়া কোনো জেলে পরিবার কিংবা লবণাক্ততায় হারিয়ে যাওয়া কোনো কৃষকের গল্প একদিন পৌঁছে যেতে পারে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের পাঠকের কাছে। জি এম মাছুম বিল্লাহর কাজও যেন সেই সেতুবন্ধনেরই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আন্তর্জাতিক একটি গ্রন্থে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়া তাই শুধু একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি সুন্দরবন ও উপকূলীয় জনপদের মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার জন্যও এক ধরনের সম্মান। বিশ্বের জলবায়ু সংকটের আলোচনায় শ্যামনগরের মানুষের জীবন ও সংগ্রামের যে বাস্তবতা স্থান করে নিচ্ছে, তার পেছনে স্থানীয় সাংবাদিকদের নিরলস শ্রমেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
সাংবাদিকতা যেখানে সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরার দায়বদ্ধতার নাম, সেখানে উপকূলের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠকে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দেওয়া নিঃসন্দেহে এক মহৎ কাজ। আর সেই কাজের স্বীকৃতি যখন আন্তর্জাতিক একটি বইয়ের পাতায় কৃতজ্ঞতার অক্ষরে লেখা হয়, তখন তা শ্যামনগর তথা সুন্দরবন উপকূলের সাংবাদিকতার জন্যও হয়ে ওঠে আনন্দ ও গর্বের সংবাদ।

