
মো.কামাল উদ্দিন: ৭ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির সমর্থনে পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে এবং নিজেদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। আন্দোলন চলাকালে শহীদদের আত্মত্যাগ ছয় দফাকে গণমানুষের আন্দোলনে পরিণত করে এবং বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে নতুন গতি দেয়। তাই ৭ জুন শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়, এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, অধিকার আদায় এবং স্বাধীনতার পথে অগ্রযাত্রার এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক জাগরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং জাতীয় আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি এক যুগান্তকারী মাইলফলক। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যেমন বাঙালির জাতীয়তাবোধের জন্ম দিয়েছিল, তেমনি ৬ দফা সেই জাতীয়তাবোধকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি যে ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, তা ছিল বাঙালির বেঁচে থাকার অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকারের ঘোষণাপত্র। এই কারণেই ৬ দফাকে বলা হয়— “বাঙালির মুক্তির সনদ”।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বৈষম্যের সূচনা
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভৌগোলিকভাবে এক হাজার মাইলেরও বেশি দূরত্বে অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান ধর্মের ভিত্তিতে এক রাষ্ট্রে আবদ্ধ হলেও বাস্তবে দুই অংশের মধ্যে অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ভাষা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছিল বিস্তর পার্থক্য।
পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল বেশি, কিন্তু ক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে। কেন্দ্রীয় সরকার, সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রপ্তানি পণ্য পাট থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়নে ব্যয় করা হলেও পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে তার সামান্য অংশও ব্যয় করা হতো না।
১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত ঘটনা বাঙালিদের বুঝিয়ে দেয় যে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে তাদের অস্তিত্ব ও অধিকার ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে।
৬ দফা ঘোষণার পটভূমি :
১৯৫৮ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করেন। গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে পাকিস্তানে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময় পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ আরও বৃদ্ধি পায়।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের গবেষণায় দেখা যায়, পাকিস্তানের উন্নয়ন পরিকল্পনার অধিকাংশ অর্থ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হচ্ছিল। পূর্ব পাকিস্তান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস হওয়া সত্ত্বেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে ছিল বঞ্চিত।
এই বাস্তবতা থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান একটি কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি বুঝতে পারেন, পূর্ব বাংলার মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের বিকল্প নেই।
ঐতিহাসিক ৬ দফা: স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা
১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন।
এই দাবিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল—
প্রকৃত ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা
জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা
কেন্দ্রের ক্ষমতা সীমিত করা
অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধ করা
রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা প্রদেশের হাতে দেওয়া
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
পাকিস্তানের ইতিহাসে এর আগে কোনো রাজনৈতিক নেতা এত স্পষ্টভাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেননি।
পাকিস্তান সরকারের আতঙ্ক
৬ দফা ঘোষণার পর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে, এই কর্মসূচি বাঙালির মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলে পাকিস্তানের বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো ভেঙে পড়বে।
আইয়ুব খান প্রকাশ্যে ৬ দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মসূচি বলে আখ্যায়িত করেন। সরকারি প্রচারণা যন্ত্র, সংবাদমাধ্যম এবং প্রশাসনকে ব্যবহার করে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
সরকারি মহল থেকে বলা হয়, শেখ মুজিব পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করছেন। কিন্তু বাস্তবে ৬ দফা ছিল পাকিস্তানের ভেতরেই পূর্ব পাকিস্তানের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি।
বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন
৬ দফা আন্দোলনের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলে পাকিস্তান সরকার কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে একের পর এক গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়। বিভিন্ন জেলা সফরের সময় তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এসব দমন-পীড়ন বাঙালির মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তোলে। সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে ৬ দফা কেবল একটি রাজনৈতিক দাবিনামা নয়, বরং তাদের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: বঙ্গবন্ধুকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা
১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে।
এই মামলার উদ্দেশ্য ছিল দ্বিমুখী—
প্রথমত, শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিত্রিত করা। দ্বিতীয়ত, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়া।
মামলায় অভিযোগ করা হয় যে তিনি ভারতের সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করেছেন। কিন্তু বাঙালি জনগণ এই অভিযোগ বিশ্বাস করেনি। বরং আগরতলা মামলা শেখ মুজিবকে সাধারণ মানুষের কাছে বাঙালির অধিকার আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে।
গণঅভ্যুত্থান ও বঙ্গবন্ধুর উত্থান
১৯৬৯ সালে ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে শুরু হয় গণআন্দোলন। এই আন্দোলনে শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে পাকিস্তান সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
এরপর থেকে তিনি কেবল আওয়ামী লীগের নেতা নন; তিনি হয়ে ওঠেন সমগ্র বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
৬ দফা থেকে স্বাধীনতার পথে
৬ দফা ছিল স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণার পূর্বপ্রস্তুতি।
১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন—
সবকিছুই একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর পরিণতিতে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
উপসংহার :
ইতিহাসের বিচারে ৬ দফা ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক মুক্তির ঘোষণাপত্র। এটি ছিল অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, রাজনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের রূপরেখা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে, মামলা দিয়েছে, রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিয়েছে, কিন্তু ৬ দফার চেতনাকে দমন করতে পারেনি। বরং প্রতিটি দমন-পীড়ন বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করেছে। তাই ৬ দফা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ, বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠ দলিল এবং বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ। ইতিহাস যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন ৬ দফা এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব বাঙালির জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

