
নিজস্ব প্রতিবেদক: চারিদিকে শুধু পানি আর পানি কোথাও পান যোগ্য পানি নেই। চারদিকে জলরাশি থাকলেও সেখানে পানের যোগ্য পানির হাহাকার নিত্যদিনের চিত্র। সুপেয় পানির এ সংকট শুধু তৃষ্ণা নয় এটি উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্য, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের সংকট। সাতক্ষীরার সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা এক উপকূলীয় জনপদ শ্যামনগর।
দীর্ঘকাল ধরে অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করার ফলে এ অঞ্চলের বাসিন্দারা পেটের পীড়া, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা ও নানাবিধ চর্মরোগে ভুগছিলেন। আর প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হেঁটে পানি বয়ে আনার মূল ভার বহন করতে হতো গৃহবধূ ও কোমলমতি মেয়েদের। শ্যামনগরের খাগড়াঘাট ও কৈখালি গ্রামের মেয়েরা বছরের পর বছর ধরে দূর-দূরান্তের পুকুর বা নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া থেকে বঞ্চিত হতো। বর্ষাকালে ধরে রাখা বৃষ্টির পানি দিয়ে দু-তিন মাস চললেও বছরের বাকি আট-দশ মাস চলত সীমাহীন দুর্ভোগ। বিশেষ করে ২০০৭ ও ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর এ এলাকার মাটি ও জলাধারের পানির লবণাক্ততা ভয়াবহ রূপ নেয়।
তবে দীর্ঘদিনের এই কষ্টের চিত্রে এখন আশার আলো ফুটতে শুরু করেছে। বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপের অর্থায়নে গ্রাম দুটিতে বসানো হয়েছে দুটি আধুনিক রিভার্স অসমোসিস (জঙ) পানি শোধনাগার। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া প্ল্যান্ট দুটির একটি খাগড়াঘাটের নূরউদ্দীনের বাড়ির সামনে এবং অন্যটি কৈখালির আলাউদ্দিন মল্লিকের বাড়ির সামনে স্থাপন করা হয়। পানির কলে ফিরেছে স্বস্তি সুযোগ।
শনিবার (১৭সেপ্টেস্বর) দুপুরে শ্যামনগর উপজেলার খাগড়াঘাট ও কৈখালী এলাকায় সুপেয় পানির প্লাটের উদ্বোধন করেন আবুল খায়ের গ্রুপের সিও সাবাব আহমেদ। এসময় বক্তব্য রাখেন, আবুল খায়ের গুপের সি আর প্রধান ফেরদৌস ফয়সাল, বেসরকারী সংস্থা বারসিক উপকূলীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শাহিন ইসলাম, শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সামিউল আযম মনির, সুপেয় পানি প্রকল্পের সভাপতি ও ভূমিদাতা নুর উদ্দীন সরদার, সমাজ সেবক, মহিউদ্দীন সরদার, তাজ উদ্দীন আহমেদ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানটির সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন, বেসরকারী সংস্থা শরুব ইয়ুথ টিমের সভাপতি জান্নাতুন নাইম। খাগড়াঘাটের গৃহবধূ রহিমা বেগম (৪৫) বলেন, “এখন কল টিপলেই মিষ্টি পানি বের হয়। এই প্রযুক্তি আমাদের জীবন বাঁচিয়ে দিল। আগে শুধু বর্ষার কয়েক মাস বৃষ্টির পানি খেতে পারতাম, বাকি সময় বাধ্য হয়ে লোনা পানি পান করে ছেলে-মেয়েদের পেটের রোগ লেগে থাকত। কৈখালি এলাকার আমেনা খাতুন বলেন, আগে “এক কলস মিষ্টি পানির জন্য দুই-তিন মাইল হাঁটতে হতো। বাড়ির কাছে পানির কল বসায় যেন আমাদের পুনর্জন্ম হয়েছে।”
পানি সংগ্রহের যাঁতাকল থেকে মুক্তি মেলায় স্থানীয় মেয়ে শিশুরাও এখন নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি, নুর উদ্দীন সরদার বলেন, আগের এই এলাকার মানুষ দূষিত ও লোনা পানি পান করতো। সুপেয় পানির আনতে বহুদুর যেতে হত। তাই এলাকার মানুষের কথা ভেবে তার নিজের জমি দান করে এই পানির প্লাট তৈরি করা হয়েছে। পানিতে আয়রনযুক্ত পানির লালচে ভাব আর নেই। এ অঞ্চলের মানুষ এখন সহজেই ঘরের দুয়ারে সুপেয় পানি পাচ্ছে। আবুল খায়ের গ্রুপের সিও শাবাব আহমেদ বলেন, “উপকূলের এ করুণ চিত্র আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমরা এমন এক টেকসই সমাধান চেয়েছিলাম। যা মানুষের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে সহায়তা করবে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ব্যাবসার পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানো। করোনাকালীন সময়ে মানুষে বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকায় সুপেয় পানির একটা তীব্র সংকট। তাই এলাকার পানির সংকটের জন্য কয়েকটি প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে যাতে মানুষ বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির সি আরও ফেরদৌস ফয়সাল বলেন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও অপচয়হীন আধুনিক ব্যবস্থাপনা পানির অপচয় রোধে নেওয়া হয়েছে স্মার্ট ব্যবস্থাপনা। প্রতিটি গ্রাহককে দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল কার্ড। ঢাকার স্মার্ট ওয়াসা ব্যবস্থার মতো কলের সামনে কার্ড ধরলে পানি পড়ে, সরালেই বন্ধ হয়ে যায়। দরিদ্র মানুষের সুবিধার জন্য এটি সম্পূর্ণ ক্যাশলেস করা হয়েছে। প্রতি লিটার পানির ব্যবস্থাপনা খরচ ধরা হয়েছে নাম মাত্র ৫০ পয়সা, যা স্থানীয় বাজারের (৮০ পয়সা/লিটার) চেয়ে অনেক সাশ্রয়ী।
বিদ্যুৎ সংযোগের ওপর চাপ কমাতে প্রতিটি প্ল্যান্টে ১০টি করে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারে পল্লী বিদ্যুতের বিল এবং লোডশেডিংয়ের নির্ভরতা থেকে মুক্ত থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাম্প চালানো সম্ভব হচ্ছে। পুরো প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তায় কাজ করছে ‘খান ট্রেডার্স’। পাশাপাশি শ্যামনগরের তরুণদের সামাজিক সংগঠন ‘শরুব ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যরা এ শোধনাগার দুটি পরিচালনা ও বিতরণ ব্যবস্থা দেখাশোনা করছেন, যা স্থানীয় বেকারত্ব দূর করতে ভূমিকা রাখছে।

