
কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় দুই বছর পর সেই রেলপথের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পুরো পথে নিয়মিত মালবাহী ট্রেন নেই। যাত্রী পরিবহনে চলছে মাত্র একটি ট্রেন। সেটিও দিনে একবারের কার্যক্রমে সীমিত। নয়টি স্টেশনের মধ্যে তিনটির কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি রেল অবকাঠামোর বড় একটি অংশই পড়ে থাকছে সীমিত ব্যবহারে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে- যে উদ্দেশ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রেলপথটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তার কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে?
রেলপথের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ১ জুন শুরু হয় বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল। যাত্রী পরিবহনের জন্য ‘মোংলা কমিউটার’ নামে যে ট্রেনটি চালু করা হয়, এরপর আর নতুন কোনো যাত্রীবাহী ট্রেন যুক্ত হয়নি। মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের ছয় দিন চলাচল করছে ট্রেনটি।
খুলনা-বেনাপোল রুটের ‘বেতনা’ ট্রেনকেই মোংলা কমিউটার হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছে। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে খুলনা থেকে ছেড়ে বেনাপোল যাওয়ার পর সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বেনাপোল থেকে আবার মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করে ট্রেনটি।
দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে মোংলায় পৌঁছে দুপুর ১টায় আবার ছাড়ে। বিকেল সাড়ে ৪টায় বেনাপোলে পৌঁছানোর পর বিকেল ৫টায় ‘বেতনা’ নামে খুলনার উদ্দেশে যাত্রা করে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে খুলনায় ফিরে আসে। অর্থাৎ মোংলা-বেনাপোল রেলপথে যাত্রীদের জন্য কার্যত পুরো দিনে একটি ট্রেনই ভরসা।
রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোংলা কমিউটারে ৭ লাখ ৩০ হাজার ৫৭০ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এ সময়ে রেলের রাজস্ব আয় হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৪৮ টাকা।
যাত্রীসংখ্যা ও আয় থাকলেও ট্রেনের সংখ্যা বাড়েনি। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সীমিত ট্রেনের কারণে অনেক যাত্রীকে বিকল্প হিসেবে সড়কপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। মোংলা-বেনাপোল রেলপথে ফুলতলা, আড়ংঘাটা, মোহাম্মদনগর, কাটাখালি, চুলকাটি বাজার, ভাগা, দিগরাজ ও মোংলা এই স্টেশনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে আড়ংঘাটা, ভাগা ও দিগরাজ স্টেশনের কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। ফুলতলা, মোহাম্মদনগর, কাটাখালি, চুলকাটি বাজার ও মোংলা স্টেশনে ট্রেনের স্টপেজ রয়েছে। অর্থাৎ রেলপথের অবকাঠামো তৈরি হলেও সব স্টেশন এখনো যাত্রীসেবায় আসেনি।
এই রুটের নিয়মিত যাত্রী মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, খুলনা থেকে মোংলা যেতে বাসে তুলনামূলক বেশি ভাড়া লাগে এবং সময়ও বেশি লাগে। ট্রেনে ভাড়া কম এবং প্রায় এক ঘণ্টায় যাওয়া যায়।
তাঁর ভাষ্য, বাগেরহাট, মোংলা ও খুলনা থেকে যশোর ও বেনাপোলে নিত্যপ্রয়োজনে যাতায়াতকারীদের অনেকেই ট্রেন ব্যবহার করতে চান। কিন্তু সারা দিনে একটি ট্রেন থাকায় প্রয়োজনের সময় সেটি পাওয়া যায় না। ফলে একটি ট্রেনেই অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
আরেকটি সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি। মোংলা থেকে ছেড়ে ট্রেনটি বিকেল সাড়ে ৪টায় বেনাপোলে পৌঁছায়। ভারতের উদ্দেশে যাওয়া যাত্রীদের জন্য সময়টি সমস্যাজনক, কারণ সন্ধ্যা ৬টার পর ইমিগ্রেশন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া ঢাকা-মোংলা রুটেও এখনো কোনো সরাসরি ট্রেন নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজনের খুলনা সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, মোংলায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ইপিজেড ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন কর্মস্থল রয়েছে। প্রতিদিন সকালে খুলনা থেকে ১০-১২টি বাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেখানে যান।
তাঁর মতে, অফিস সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রেন চালানো গেলে কম খরচে এবং কম সময়ে এসব কর্মজীবীর কর্মস্থলে যাতায়াত সম্ভব হতো। কিন্তু ট্রেনের সংখ্যা না বাড়ায় সেই সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
এই রেলপথের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা ছিল মোংলা বন্দরের পণ্য পরিবহন। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে নিতে যে অতিরিক্ত সময় ও খরচ হয়, তার বিকল্প হিসেবে মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করার কথা ছিল।
কুদরত-ই-খুদা বলেন, উত্তরবঙ্গের বগুড়া ও দিনাজপুরের কৃষিসহ বিভিন্ন পণ্য বর্তমানে বেশি খরচে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি করা হয়। নিয়মিত মালবাহী ট্রেন চালু হলে এসব পণ্য মোংলা বন্দর দিয়ে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি নিয়মিত মালবাহী ট্রেন নেই।
খুলনা রেলস্টেশনের টিআই অংশুমান রায় চৌধুরী বলেন, একটি স্টেশন সচল রাখতে সাধারণত তিনজন স্টেশন মাস্টার, ছয়জন পয়েন্টসম্যান, তিনজন বুকিং সহকারী, একজন পোর্টার ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা জনবল দরকার হয়।
কিন্তু পুরো রুটে ডেপুটেশনে আসা মাত্র ১১ জন জনবল দিয়ে পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
খুলনা রেলওয়ের পাকশী বিভাগের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা হাসিনা খাতুনও স্বীকার করেন, যাত্রীদের চাহিদা বিবেচনায় এ রুটে আরও ট্রেন প্রয়োজন। এ জন্য আরও একটি ট্রেন চালুর প্রস্তাব রেল মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তবে তাঁর ভাষ্য, নতুন ট্রেন চালুর পাশাপাশি বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো চালু করতেও জনবল প্রয়োজন। জনবল মঞ্জুর হলে ট্রেন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা হাসিনা খাতুন জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে **৩০ ট্রিপ মোলাসেস, চিটা ও গুড়** মোংলা বন্দর থেকে জয়পুরহাটে পরিবহন করা হয়েছে।
তবে অন্যান্য পণ্য পরিবহনের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি।
এখানে আরেকটি বাস্তব সমস্যা সামনে এসেছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনার বা কার্গো ট্রেন চাইলেও রেলওয়ের কাছে বর্তমানে সে ধরনের ট্রেন নেই। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও রেলে পণ্য পরিবহনে আগ্রহ তুলনামূলক কম বলে রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রকল্পটির সাবেক পরিচালক (পিডি) আহমেদ হোসেন মাসুম বলেন, মোংলা বন্দরের পণ্য সহজ, সাশ্রয়ী ও দ্রুত পরিবহন এবং বন্দর ব্যবহার করে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোই ছিল রেলপথ নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তাঁর মতে, শুধু রেললাইন নির্মাণ করলেই এই উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। বন্দর ও রেলওয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফাও বলেন, রেলে পণ্য পরিবহনের জন্য বন্দর প্রস্তুত রয়েছে। তবে আমদানিকারকসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাঁর মতে, প্রথমে কনটেইনার ও মালবাহী ট্রেন চালু করা দরকার। পাশাপাশি ঈশ্বরদী ও উত্তরা ইপিজেডের ভেতরে রেললাইন সংযোগ দেওয়া হলে ফল, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য রেলে পরিবহনের সুযোগ বাড়বে।
মোংলা-বেনাপোল রেলপথ নির্মাণ হয়েছে ভারতীয় অর্থায়নে। ফলে প্রকল্পের অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে পরিশোধ করতে হবে। সাবেক প্রকল্প পরিচালক আহমেদ হোসেন মাসুম জানান, রেলপথটি ভারতীয় অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে এবং ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো টাকা পরিশোধ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর কাছে তথ্য নেই।
পাকশী বিভাগের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক লিয়াকত শরীফ খানও ঋণ পরিশোধের বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ)সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ঋণ পরিশোধের নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
মোংলা-বেনাপোল রেলপথ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে মূল অবকাঠামো তৈরি হলেও তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। একদিকে ৪ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রেলপথে দিনে চলছে মাত্র একটি যাত্রীবাহী ট্রেন। অন্যদিকে নয়টি স্টেশনের মধ্যে তিনটি এখনো কার্যক্রমের বাইরে। নিয়মিত মালবাহী ট্রেনও নেই।
অথচ এই রেলপথের মূল লক্ষ্য ছিল শুধু যাত্রী পরিবহন নয় মোংলা বন্দরের পণ্য পরিবহনকে রেলনির্ভর করা, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা।
এখন সেই লক্ষ্য বাস্তবে কতটা এগিয়েছে, তার উত্তর খুঁজতে হলে শুধু রেললাইন নির্মাণের হিসাব নয়, বরং কতটি ট্রেন চলছে, কত পণ্য পরিবহন হচ্ছে, কত স্টেশন সচল এবং বিনিয়োগের বিপরীতে কী ধরনের ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে সেই হিসাবও সামনে আনতে হবে।
কারণ রেললাইন তৈরি করাই শেষ কথা নয়; বিপুল অর্থে তৈরি অবকাঠামো নিয়মিত ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারলেই এর মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে।

