
মেহেদী হাসান: খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্টিন চলছে কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায়, কার অনুমতিতে এবং কার নিয়ন্ত্রণে, তার স্পষ্ট উত্তর মিলছে না হাসপাতাল প্রশাসনের কাছ থেকেই। সরকারি এই হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্যান্টিন পরিচালিত হলেও এর বৈধ ইজারা, চুক্তি এবং অর্থ জমার হিসাব নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে হাসপাতালের পরিচালককে ঘিরেই। কারণ ক্যান্টিনের বর্তমান পরিচালনাকারী কারা এমন প্রশ্নে পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ক্যান্টিন ইজারা দেওয়ার নিয়ম নেই এবং আগে যারা চালাচ্ছিল, তারাই এখনও চালাচ্ছেন। অথচ হাসপাতালের উপ-পরিচালক বলছেন, ইজারা ছাড়া সরকারি কোষাগারে টাকা দেওয়ার সুযোগ নেই এবং ক্যান্টিনটি ইজারা দেওয়ার জন্য পরিচালককে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়কও জানিয়েছেন, তিনি চান ক্যান্টিনটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হোক।ফলে প্রশ্ন উঠছে- ইজারা না থাকলে ক্যান্টিনটি চলছে কীভাবে? আর পরিচালক যদি জানেন কারা এটি পরিচালনা করছেন, তাহলে তাদের পরিচয় ও পরিচালনার বৈধ ভিত্তি স্পষ্ট করা হচ্ছে না কেন?অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর প্রায় এক বছর বন্ধ ছিল খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্টিন। পরে সেটি আবার চালু হয়। একাধিক সূত্রের দাবি, প্রথম দিকে জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্যান্টিনটি পরিচালনা শুরু করেন। পরে জাতীয়তাবাদী ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একটি চুক্তিনামার মাধ্যমে ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানা যায়। তবে কখন, কার সঙ্গে এবং কী প্রক্রিয়ায় এই চুক্তি হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট নথি বা তথ্য অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।সম্প্রতি হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ক্যান্টিনে গিয়ে কথা হয় কর্মী মারুফের সঙ্গে। তিনি জানান, ক্যান্টিনের ম্যানেজার হিসেবে ইন্টার্ন চিকিৎসক আরাফাত এবং পরিচালনার সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ইন্টার্ন চিকিৎসক কামরানের সম্পৃক্ততার কথা। তবে ম্যানেজার আরাফাতের মোবাইল নম্বর চাইলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।পরে জাতীয়তাবাদী ইন্টার্ন চিকিৎসক কামরানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যান্টিন পরিচালনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। কামরানের দাবি, ৫ আগস্টের পর ক্যান্টিনটি জামায়াত-শিবিরের লোকজন দখলে নেয়। বর্তমানে যারা এটি পরিচালনা করছেন, তারা হয়তো তাঁর নাম ব্যবহার করছেন। তবে ক্যান্টিন পরিচালনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং কোনো কাগজপত্রেও তাঁর নাম নেই বলে দাবি করেন তিনি।কামরানের বক্তব্যের পর প্রশ্ন আরও জোরালো হয় তাহলে বর্তমানে ক্যান্টিন পরিচালনা করছেন কারা? ক্যান্টিন পরিচালনার বিপরীতে অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা।একাধিক সূত্রের দাবি, ক্যান্টিন থেকে অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টি হাসপাতালের ক্যাশিয়ার মো. আলিমুজ্জামানের জানা রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ক্যান্টিনের জন্য প্রতি বর্গফুট ২০ টাকা হিসাবে মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু এই টাকা কে দেন, কোন খাতে জমা হয় কিংবা এর বিপরীতে কোনো বৈধ চুক্তি রয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট তথ্য দেননি। বরং বিষয়টি জানতে হাসপাতালের বড়বাবু মাহবুব হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।বড়বাবু মাহবুব হোসেনও বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, তিনি কিছু জানেন না; অ্যাকাউন্টেন্ট হয়তো তথ্য দিতে পারবেন। অ্যাকাউন্টেন্টের নম্বর চাইলে প্রথমে তাঁর কাছে নম্বর নেই বলে জানান তিনি। পরে কলব্যাক করে অ্যাকাউন্টেন্টের সহকারী রাজুর নম্বর দেন। রাজু জানান, ক্যান্টিনের টাকা জমার বিষয়টি ক্যাশিয়ারের জানার কথা; এটি তাঁদের বিষয় নয়।অর্থাৎ, টাকা নেওয়া হচ্ছে কিন্তু কার কাছ থেকে, কোন চুক্তির ভিত্তিতে এবং কোন খাতে জমা হচ্ছে, তা নিয়েই স্পষ্টতা নেই।ক্যান্টিনের বৈধতা ও চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান জানান, একটি চুক্তিনামার মাধ্যমে কিছু টাকা জমা হওয়ার কথা ছিল। তবে সেটি আদৌ হচ্ছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ইজারা ছাড়া চুক্তিনামার মাধ্যমে ক্যান্টিন পরিচালনার বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনিও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। তবে ৫ আগস্টের পর ক্যান্টিনটির দুই দফা হাতবদল হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।তত্ত্বাবধায়কের ভাষ্য, ক্যান্টিনটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হোক এটি তিনি চান।হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. সুজাত আহম্মেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ক্যান্টিনটি বর্তমানে কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটি তাঁর জানা নেই। তিনি জানান, ইজারা ছাড়া সরকারি কোষাগারে টাকা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছেন। মোটরসাইকেল গ্যারেজ ইতোমধ্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং ক্যান্টিনটিও ইজারা দেওয়ার জন্য পরিচালককে জানানো হয়েছে।উপ-পরিচালকের এই বক্তব্যের সঙ্গে পরিচালকের বক্তব্যের এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের অসঙ্গতি।ক্যান্টিনের বর্তমান পরিচালনাকারী, ইজারা ও চুক্তির বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, হাসপাতালের ক্যান্টিন ইজারা দেওয়ার নিয়ম নেই। তাঁর দাবি, আগে যারা ক্যান্টিন চালাচ্ছিল, তারাই এখনও চালাচ্ছে। তবে কারা ক্যান্টিনটি পরিচালনা করছেন এমন সরাসরি প্রশ্ন করা হলে পরিচালক বলেন, ক্যান্টিনে গিয়ে খোঁজ নিতে। এরপর ক্যান্টিন পরিচালনার বৈধতা ও সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে আরও প্রশ্ন করার আগেই মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।ফলে পরিচালকের বক্তব্যও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে- ইজারা দেওয়ার নিয়ম না থাকলে ক্যান্টিন পরিচালনার ভিত্তি কী? আর আগে যারা চালাতেন, তাঁরা কারা- তাদের সঙ্গে বর্তমান প্রশাসনের কোনো লিখিত চুক্তি আছে কি না?একটি সরকারি হাসপাতালের ভেতরে ক্যান্টিন পরিচালিত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। সেখানে নিয়মিত অর্থ লেনদেনের কথাও উঠে এসেছে। কিন্তু ক্যান্টিনের বৈধতা, পরিচালনাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং অর্থ জমার খাত কোনোটিরই পরিষ্কার তথ্য দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একদিকে পরিচালক বলছেন, ক্যান্টিন ইজারা দেওয়ার নিয়ম নেই এবং আগের লোকজনই চালাচ্ছেন।অন্যদিকে উপ-পরিচালক বলছেন, ইজারা ছাড়া সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেওয়ার সুযোগ নেই এবং ক্যান্টিন ইজারা দেওয়ার জন্য পরিচালককে জানানো হয়েছে। তত্ত্বাবধায়কও বলছেন, তিনি ক্যান্টিনটি ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত দেখতে চান।তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়- ইজারা না থাকলে ক্যান্টিনটি বর্তমানে কার অনুমতিতে চলছে? মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকা কে দিচ্ছেন এবং কোন খাতে সেই টাকা জমা হচ্ছে?ক্যান্টিন পরিচালনার সঙ্গে কারা যুক্ত? কোন চুক্তির ভিত্তিতে তারা সরকারি হাসপাতালের জায়গা ব্যবহার করছেন?আর যদি হাসপাতাল প্রশাসনের শীর্ষ দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাই ক্যান্টিনের বর্তমান পরিচালনাকারীদের বিষয়ে একক ও স্পষ্ট তথ্য দিতে না পারেন, তাহলে সরকারি হাসপাতালের ভেতরে এতদিন ধরে এই ক্যান্টিন পরিচালিত হচ্ছে কীভাবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।বিশেষ করে, ক্যান্টিনের বৈধতা ও পরিচালনাকারীদের বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পরিচালকের মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘটনাও বিষয়টিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।এখন প্রয়োজন ক্যান্টিন পরিচালনার চুক্তি, ইজারা-সংক্রান্ত নথি, অর্থ জমার রসিদ ও সরকারি হিসাবের খাত প্রকাশ করা। তাহলেই স্পষ্ট হবে ক্যান্টিনটি আসলে কোন প্রক্রিয়ায় চলছে এবং এর পেছনে প্রশাসনিক অনুমোদন বা দায় কার।

