
মোহাম্মদ মুজাহিদ: সাতক্ষীরার দেবহাটায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া এবং ভুয়া ডিগ্রি বানিয়ে চিকিৎসার নামে প্রতারণা চালানো শেখ এবাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অবশেষে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবে নজিরবিহীন জালিয়াতি ও অপচিকিৎসার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার পরও তাকে গ্রেপ্তার বা চেম্বার সিলগালা না করে কেবল এক টুকরো শর্তসাপেক্ষ মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সাধারণ রোগীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খাওয়া ও সাংবাদিকদের হেনস্তা করার পরও এমন লঘু পদক্ষেপে পুরো জেলা জুড়ে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ। নওয়াপাড়া ইউনিয়নের আস্কারপুর গ্রামে প্রাতিষ্ঠানিক বিচারে নিম্নমাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরোনো শেখ এবাদুল ইসলাম নিজেকে ঢাকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি (icddr,b)-এর ডিগ্রিধারী দাবি করে আসছিলেন। বিএমডিসি (BMDC) সনদের কোনো তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর নিরীহ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের মাধ্যমে শারীরিক ক্ষতির মুখে ফেলার নজির সামনে আসে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম গত ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে শেখ এবাদুলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে ১১ অক্টোবরের মধ্যে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন ও আইসিডিডিআর,বি-এর মূল সনদ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে (১১ অক্টোবর ২০২৬) কথিত এই ডাক্তার তার দাবিকৃত ডাক্তারি সনদ কিংবা ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখাতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হন। এর মাধ্যমে সরকারি নথিতেই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হলো শেখ এবাদুল ইসলাম একজন ভুয়া ডাক্তার ও প্রতারক!জালিয়াতি ও বেআইনি চিকিৎসা ব্যবসার অপরাধ হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও এবং পূর্বে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কর্তৃক ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে চেম্বার সিলগালা ও কঠোর আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হলেও, বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ভুয়া ডাক্তার এবাদুলের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে স্রেফ একটি মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মুচলেকায় শেখ এবাদুল স্বীকার করেন যে, তিনি একজন গ্রাম্য ডাক্তার এবং সরকারি বিধি-বিধান মেনে চলবেন ও কোনো উচ্চ অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ দেবেন না। অথচ সচেতন মহলের প্রশ্ন যে লোক নিম্নমাধ্যমিক পাস না করে বিএমডিসি ও আইসিডিডিআর,বি-এর মতো নামীদামি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া ডিগ্রি বানিয়ে দীর্ঘদিন হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলল, তার বিরুদ্ধে ভুয়া সনদের জালিয়াতি মামলা ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিক চেম্বার সিলগালা হলো না কেন? শুরু থেকেই এই ভুয়া ডাক্তারের পক্ষাবলম্বন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এবাদুলের সন্ত্রাসী বাহিনীর চড়াও হওয়ার পর জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালামের ঢিলেঢালা মন্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছিল।
অনুসন্ধানী তথ্যে সত্যতা মেলার পরও অপরাধীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল কাগজে-কলমে মুচলেকা নিয়ে দায় এড়ানোর এই চেষ্টা স্বাস্থ্য বিভাগের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ভুয়া ডাক্তারের কাছে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সোপর্দ করে স্রেফ মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া অপরাধকে এক প্রকার প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল। সামান্য একটি অঙ্গীকারনামা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ায় এই প্রতারক চক্র আবারও আড়ালে অপচিকিৎসা চালিয়ে যাবে বলে শঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা। প্রেসক্রিপশনে বিএমডিসি ব্যতিরেকে ডাক্তার পদবি ব্যবহার ও ভুয়া ডিগ্রির প্রচার চালানো দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য ও অসংজ্ঞানীয় অপরাধ।
আস্কারপুর ও আশপাশের প্রতারিত জনগণের একদাবি, প্রশাসনের এই ঢিলেঢালা ও লোকদেখানো লোকভুলানো ব্যবস্থা তারা মেনে নেবেন না। ভুয়া সনদ জালিয়াতির মূল হোতা শেখ এবাদুলকে দ্রুত গ্রেপ্তার, তার চেম্বার স্থায়ীভাবে সিলগালা এবং এর পেছনে থাকা মদদদাতাদের খুঁজে বের করে কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক শুনানিতে তিনি তার দাবিকৃত আইসিডিডিআর,বি বা বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশনের কোনো বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শন করতে পারেননি। চিকিৎসা ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং গ্রামীণ চিকিৎসকদের সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার জন্যই তার থেকে লিখিত মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। তিনি সরকারি আদেশ ও বিধিনিষেধ মেনে গ্রাম্য ডাক্তার হিসেবে চিকিৎসাসেবা প্রদান করবেন এবং কোনোভাবেই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা বিএমডিসি ছাড়া ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না।
এই শর্ত অমান্য করলে কিংবা আবারও কোনো জালিয়াতি বা অপচিকিৎসার অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা ও চেম্বার সিলগালা করা হবে।

