
শেখ আব্দুল হাকিম, শ্যামনগর থেকে: শ্যামনগর উপজেলা খাদিজা নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে বাস্তবে ছাত্রী না থাকার অভিযোগের মধ্যেই ৮৫ জনের নামে ৮৫ সেট সরকারি পাঠ্যবই উত্তোলনের তথ্য সামনে এসেছে। বিদ্যালয়ের নথিতে শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ১২২ জন। একই প্রতিষ্ঠানের আটজন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারীর সরকারি বেতন-ভাতা এবং শিক্ষার্থীদের নামে উপবৃত্তির অর্থ গ্রহণের বিষয়টি নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
বিদ্যালয়টির নাম শংকরকাটি খাদিজা নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের আল আজাদ। আর শিক্ষার্থীসংক্রান্ত তথ্য যাচাই ও শিক্ষা কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মুহাম্মদ (তেজারত) এখন নানা প্রশ্নের মুখে।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ে ছাত্রী না থাকার অভিযোগ, নথিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং সরকারি বই উত্তোলনের তথ্য—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম ও সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে স্থানীয়ভাবে।
ছাত্রী নেই, তবু ৮৫ সেট বই কার জন্য?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টির ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ২৫ সেট, সপ্তম শ্রেণির জন্য ৩০ সেট এবং অষ্টম শ্রেণির জন্য ৩০ সেট সরকারি পাঠ্যবই উত্তোলন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৮৫ সেট বই।
প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যালয়ে যদি বাস্তবে ছাত্রী না থাকে, তাহলে এসব বই কোন শিক্ষার্থীদের জন্য উত্তোলন করা হয়েছিল? বই বিতরণের তালিকায় থাকা শিক্ষার্থীদের পরিচয়, ভর্তি-সংক্রান্ত নথি এবং বই গ্রহণের স্বাক্ষর যাচাই করা হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মুহাম্মদ (তেজারত) মুঠোফোনে বলেন, ‘খাদিজা নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বই ফেরত নেওয়া হয়েছে।
তবে কী কারণে বই ফেরত নেওয়া হয়েছে, উত্তোলিত সব বই ফেরত এসেছে কি না এবং বই উত্তোলনের সময় শিক্ষার্থীদের তালিকা যাচাই করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
কাগজে ১২২ শিক্ষার্থী, বেতন-ভাতা পান ১০ জন: বিদ্যালয়টির নথিতে ১২২ জন শিক্ষার্থী থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ছাত্রী উপস্থিতি না থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা থাকার কথাও উঠে এসেছে আগের অনুসন্ধানে।
এর মধ্যেই আটজন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারীর সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদান কার্যক্রমের বাস্তব অবস্থা কি, শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন কি না এবং তাঁদের বেতন-ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না।
শ্যামনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার মিনা হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, শংকরকাটি খাদিজা নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষকরা বসে বসে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।
তবে উপবৃত্তির অর্থ পেয়েছে কারা?
শিক্ষার্থী না থাকার অভিযোগের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নামে উপবৃত্তি উত্তোলনের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থীরা বাস্তবে ওই বিদ্যালয়ে ভর্তি কি না, তাঁদের নিয়মিত উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে কি না এবং উপবৃত্তির অর্থ প্রকৃত শিক্ষার্থী বা তাঁদের অভিভাবকেরা পেয়েছেন কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
এ জন্য ভর্তি রেজিস্টার, শিক্ষার্থীদের পরিচয় ও অভিভাবকের তথ্য, শ্রেণিভিত্তিক উপস্থিতির খাতা এবং উপবৃত্তির অর্থ পাঠানোর ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
তবে এ পর্যন্ত উপবৃত্তির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা আর্থিক নথি পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থের প্রকৃত প্রাপক ও ব্যবহারের বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তদন্ত প্রয়োজন।
শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১৫ শতাংশ ঘুষের অভিযোগ:
বিদ্যালয়টির বেতন-ভাতা উত্তোলনের সুযোগ অব্যাহত রাখার বিনিময়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মুহাম্মদ (তেজারত) ১৫ শতাংশ হারে অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। অভিযোগটি গুরুতর হলেও এর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে নূর মুহাম্মদ (তেজারত) মুঠোফোনে বলেন, শিক্ষার্থীশূন্য বিদ্যালয়ে টাকার বিনিময়ে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং ভুয়া শিক্ষার্থীদের নামে উপবৃত্তি উত্তোলনে সহযোগিতা করার অভিযোগ সত্য নয়। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন, বেতন-ভাতা অনুমোদনের নথি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
শোকজের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
এর আগে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের আল আজাদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়। নূর মুহাম্মদ (তেজারত) স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পাঠদান, পাঠ্যপুস্তক, উপবৃত্তি, শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য এবং বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
তবে শোকজের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না, বিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষার্থীসংখ্যা যাচাই করা হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থের হিসাব নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবির এ বিষয়ে বলেন, তিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মুহাম্মদ (তেজারত)-এর সঙ্গে কথা বলবেন এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বক্তব্য দিতে রাজি নন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল খায়ের আল আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি নই।
শিক্ষার্থী না থাকার অভিযোগের মধ্যেও আটজন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারীর বেতন-ভাতা গ্রহণ, উপবৃত্তি এবং ৮৫ জনের নামে সরকারি বই উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো কৈফিয়ত দিতে পারব না। আপনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে কথা বলেন।থ এরপর তিনি কথোপকথনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনকের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও বিদ্যালয়ের নথি যাচাই করে প্রকৃত চিত্র বের করতে কয়েকটি বিষয়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক তদন্ত প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—নথিতে থাকা ১২২ শিক্ষার্থীর বাস্তব অস্তিত্ব ও ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই, ৮৫ সেট বই উত্তোলন ও ফেরতের হিসাব পরীক্ষা, উপবৃত্তির অর্থের প্রকৃত প্রাপক শনাক্ত করা এবং আটজন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারীর উপস্থিতি ও পাঠদান কার্যক্রম যাচাই। পাশাপাশি গত কয়েক বছরের বেতন-ভাতা উত্তোলনের নথি, বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণের তথ্য এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা ১৫ শতাংশ ঘুষের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

