
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুলনার রূপসা উপজেলার ৩নং নৈহাটী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের রহিম নগর গ্রামে প্রায় ৩০ বছর ধরে চলছে ভৈরব নদীর ভাঙন। সময়ের সঙ্গে নদী এগিয়ে এসেছে লোকালয়ের দিকে, আর একের পর এক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ঘরবাড়ি ও বসতভিটা। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় দুই শতাধিক বাড়ি নদীতে চলে গেছে। নিজের ঘর হারিয়ে অনেকে এখন অন্যের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আবার কেউ সব হারিয়ে বাধ্য হয়েছেন অন্যত্র পাড়ি জমাতে। একসময় যেখানে ছিল মানুষের বসতি, সংসার আর স্বপ্ন সেখানেই এখন ভৈরবের জল। পড়ে আছে শুধু ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। বছরের পর বছর ধরে নদী ভাঙলেও স্থায়ী প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রতিশ্রুতি আর মাপজোকের মধ্যেই কেটে গেছে দীর্ঘ সময়; কিন্তু ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিদিনই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ।
স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম বলেন, একসময় এখানে আরও ২৫ থেকে ৩০টি ঘর ছিল। ভৈরবের ভাঙনে সেসব ঘর আজ নদীগর্ভে। পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে গেছে অথবা পাশেই ভাড়াটিয়া হিসাবে আছে। এখন এই এলাকায় বসবাসের মতো পরিবেশও নেই। বছরের পর বছর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এসে মাপজোক করেছেন, কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন; কিন্তু বাস্তবে সেই আশ্বাসের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। মাপজোক আর প্রতিশ্রুতির মধ্যেই কেটে গেছে বছরের পর বছর। আর ততদিনে নদী কেড়ে নিয়েছে মানুষের ঘর, ভিটে ও বসতভূমি।
ষাটোর্ধ্ব ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে ভেসে আসে আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, ছেলেমেয়ে নিয়ে রাতে এখানে টিকতে পারি না ভয়ে। তুফানের তাণ্ডব শুরু হলেই ভয়েতে ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসি। ভাঙতে ভাঙতে সবই তো ভেঙে যাচ্ছে। এভাবে আমরা কী করে বসবাস করব? আমরা খুব অসহায় অবস্থার মধ্যে আছি।
জাকির হোসেনের কণ্ঠেও এখন ঘর হারানোর আতঙ্ক। তিনি বলেন, এখান থেকে অনেক পরিবারই চলে গেছে। ভাঙন যেভাবে এগিয়ে আসছে, হয়তো আমাদেরও একদিন চলে যেতে হবে। নিজের ঘর যদি না থাকে, তাহলে অন্যের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা ওমর আলী শেখ বলেন, এই ভাঙনের কথা জানাতে আমরা কতবার যে কত মানুষের কাছে গেছি, তার হিসাব নেই। অনেকেই এসেছেন, অনেকের কাছে আমরা নিজেরাই গিয়েছি, এমনকি অনেক সংসদ সদস্যের কাছেও ধরনা দিয়েছি। সবাই শুনেছেন, আশ্বাসও দিয়েছেন। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্বাসের কোনো সুফল আমরা পাইনি। নদী ঠিকই ভাঙছে, অথচ আমাদের কষ্ট আর দুর্ভোগ যেন একই জায়গায় পড়ে আছে।
খুলনা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলফিকার আলী জুলু টাইমস টুডে’কে জানান, রহিম নগরের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা বিবেচনায় নিয়ে ভৈরব নদীর ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল।
খুলনা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান মুঠোফোনে টাইমস টুডে’কে বলেন, ভৈরব নদীর ভাঙন পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। এলাকা ভাঙনকবলিত হিসেবে চিহ্নিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভাঙনের শব্দে প্রতিদিনই যেন মুছে যাচ্ছে একটি একটি করে ঠিকানা। রহিম নগরের মানুষের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন আর কত ঘর হারালে থামবে এই ভাঙন? তাদের আকুতি, নদীর করাল গ্রাস থামুক, ফিরে আসুক হারানো ঠিকানা, আর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু।

