
মাসুম বেলাল কাইয়ুম, শ্যামনগর থেকে: বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষকের জীবন-জীবিকা, খাদ্যসংস্কৃতি এবং কৃষিবৈচিত্র্যের সঙ্গে স্থানীয় ধানের জাতগুলো গভীরভাবে সম্পর্কিত। স্থানীয় কৃষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এসব ধান এ অঞ্চলের মাটি, পানি ও জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চাষ হয়ে আসছে। কিন্তু আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতের ব্যাপক বিস্তারের কারণে অনেক স্থানীয় ধানের জাত ধীরে ধীরে কৃষকের মাঠ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় বীজ, কৃষিজ্ঞান ও কৃষি ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং কৃষকের মাঠে এসব জাতের পুনঃপ্রবর্তন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পশ্চিম জেলেখালী গ্রামের কৃষকদের স্থানীয় ধান সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ২০০১ সাল থেকে উপকূলীয় এলাকায় স্থানীয় বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ব্যবহার ও সম্প্রসারণ নিয়ে প্রায়োগিক গবেষণা এবং বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো কৃষকের নিজস্ব বীজসম্পদ, স্থানীয় জ্ঞান এবং কৃষিবৈচিত্র্যকে শক্তিশালী করা। পাশাপাশি কৃষকদের নিজেদের মধ্যে বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করাও এ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বারসিক এলাকার কৃষক ও কৃষির প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নিয়ে প্রতি বছর মৌসুমভিত্তিক ধান,সবজি, মসলা ও বিভিন্ন ফলজ উদ্ভিদের বীজ সহায়তা করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি আমন মৌসুমে স্থানীয় কৃষকদের চাহিদার ভিত্তিতে স্থানীয় ধানের বীজ সহায়তা করা হয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন কৃষক-কৃষাণী এসব ধানের বীজ সংগ্রহ করেন। তাদের মধ্য থেকে পশ্চিম জেলেখালী গ্রামের ২৬ জন কৃষক সম্মিলিতভাবে একই স্থানে প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে স্থানীয় চিনিকানি ধান চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন। এককভাবে অল্প পরিমাণ জমিতে চাষের পরিবর্তে একাধিক কৃষকের সম্মিলিত উদ্যোগে একই এলাকায় এ ধানের চাষ স্থানীয় জাত সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকরা একে অপরের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারবেন এবং উৎপাদিত ধান থেকে মানসম্মত বীজ নির্বাচন ও সংরক্ষণের সুযোগ পাবেন। ভবিষ্যতে এসব বীজ অন্যান্য কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও চিনিকানি ধানের চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিনিকানি ধান এ এলাকার একটি পুরোনো ও পরিচিত স্থানীয় জাত। তাদের কাছে স্থানীয় ধানের জাত শুধু একটি ফসল নয়; এটি তাদের খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি ও কৃষি ঐতিহ্যের অংশ। কৃষকদের মতে, চিনিকানি ধান এ অঞ্চলের পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এ ধানের চাল ও ভাতের স্বাদ এবং গুণগত মান ভালো হওয়ায় পারিবারিক খাদ্যচাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে। সাধারণ ধানের তুলনায় চিনিকানি ধানের বাজারমূল্য তুলনামূলক বেশি হওয়ায় কৃষকরাও এটিকে একটি সম্ভাবনাময় স্থানীয় ধানের জাত হিসেবে বিবেচনা করছেন।
পশ্চিম জেলেখালী গ্রামের কৃষকভূধর চন্দ্র ম-লবলেন,চিনিকানি আমাদের এলাকার পুরোনো ধান। এর ভাতের স্বাদ ভালো, গুণও ভালো। বাজারে এ ধানের দামও বেশি। তাই আমরা আবার বেশি করে এ ধান চাষ করতে চাই।
এই সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকরা শুধু নিজেদের জমিতে একটি স্থানীয় ধানের জাত চাষ করছেন না; বরং হারিয়ে যেতে বসা স্থানীয় কৃষি ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। আগামী মৌসুমে উৎপাদিত ধান থেকে ভালো বীজ নির্বাচন ও সংরক্ষণ করে অন্যান্য কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।চিনিকানি ধানের চাষ সম্প্রসারিত হলে স্থানীয় কৃষকদের নিজস্ব বীজের ওপর নির্ভরতা বাড়বে এবং কৃষিবৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও টিকে থাকবে।অন্যদিকে, চিনিকানি ধানের বাজারমূল্য তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে এ ধানের চাহিদা ও বাজার আরও সম্প্রসারিত হলে কৃষকরা ভবিষ্যতে এ জাতের ধান চাষে আরও আগ্রহী হবেন।
২৬ জন কৃষকের সম্মিলিতভাবে প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে চিনিকানি ধান চাষের উদ্যোগ পশ্চিম জেলেখালী গ্রামে স্থানীয় ধান সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি নতুন সম্ভাবনার সূচনা করেছে। কৃষকদের চাহিদা, স্থানীয় জ্ঞান এবং বারসিকের বীজ সহায়তার সমন্বয়ে স্থানীয় ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাত আবার কৃষকের মাঠে ফিরে এসেছে।
স্থানীয় কৃষকের কাছে স্থানীয় ধানের বীজ শুধু একটি কৃষি উপকরণ নয়; এটি খাদ্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই চিনিকানি ধানের চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পশ্চিম জেলেখালীর কৃষকরা শুধু একটি ধানের জাত সংরক্ষণ করছেন না, বরং নিজেদের স্থানীয় বীজসম্পদ, কৃষিবৈচিত্র্য এবং কৃষি ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার একটি সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

