
মোঃ ইশারাত আলী, কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) থেকে :
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ফসলি জমি ও মৎস্যঘের তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন কৃষক ও ঘের মালিকরা। নদ-নদীতে স্বাভাবিক জোয়ার থাকলেও খাল ও স্লুইজ গেট অকার্যকর হয়ে পড়ায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের খাল দখল, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থাপনার কারণে কালিগঞ্জের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
কালিগঞ্জের পানি নিষ্কাশনের প্রধান অবকাঠামো ৪১টি স্লুইজ গেট। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এর বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়মিত সংস্কার ও তদারকির অভাবে বৃষ্টির পানি সময়মতো নামতে পারছে না। অনেক স্লুইজ গেট এখন মানুষের চলাচলের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে নির্মিত অধিকাংশ স্লুইজ গেটের প্রস্থ মাত্র ৫ থেকে ৬ ফুট। দুই পাশে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ এত বছরেও এগুলো আধুনিকায়ন বা সম্প্রসারণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থা। কৃষিজমিতে ঘের নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অধিকাংশ ঘের মালিক স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
আদি যমুনা, কাঁকশিয়ালী, ইছামতি, কালিন্দি ও গলঘেষিয়া নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছোট-বড় শতাধিক খালের বড় অংশ বর্তমানে দখল হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অনেক খালের শ্রেণি পরিবর্তন করে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করা হয়েছে। কোথাও কোথাও খাল ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রিও করা হয়েছে।
গত বর্ষা মৌসুমে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনুজা মন্ডল বিভিন্ন খাল পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে তিনি ঠেকরা চৌমুহনী থেকে খেজুরতলা পর্যন্ত বড় খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। খালের জায়গা জরিপ করে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বদলির পর সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।
সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল খননের ঘোষণা দেওয়ার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি ও বিএডিসি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ৩৩টি খালের তালিকা দিয়েছে, এলজিইডি ১১টি এবং বিএডিসি ১৬টি খাল খননের কাজ করছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৬০টি খাল তালিকাভুক্ত হলেও স্থানীয়দের দাবি, এখনো শতাধিক খাল ও প্রায় ৫০টি স্লুইজ গেট অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, গত ২৫ বছরে অন্তত ৬০টি খাল দখল হয়ে গেছে। অনেক খাল দখলের প্রক্রিয়ায় আছে। একই সাথে অনেক খাল প্লট আকারে বিক্রি হয়ে গেছে। সরেজমিনে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুলতলী থেকে কাঁকশিয়ালী নদী হয়ে গলঘেষিয়া নদীর কালিকাপুর পর্যন্ত প্রায় ৬১ কিলোমিটার এলাকায় অসংখ্য খাল রয়েছে। আবার কালিগঞ্জ সদর থেকে কাঁকশিয়ালী হয়ে বাঁশতলা ব্রিজ পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার নদীপথের দক্ষিণ পাশে রয়েছে প্রায় ৫০টি ছোট-বড় খাল এবং ১০টির বেশি স্লুইজ গেট। এর অধিকাংশই অকার্যকর।
উপজেলায় বিলগুল্লি, মাচুর, খারহাট, সুইলপুর, সাতবসু, খাঞ্জিয়া, বসন্তপুর, গোলখালী, আমিয়ান, আমবাড়ি, তাড়ালী, তেতুলিয়া, ঘুশুড়ী, বরেয়া, সুন্দরখালী, হাড়দ্দা, ডেমরাইল, বাহাদুরপুর, কুলতলী, পরাণপুর, উত্তর শ্রীপুর, গোবিন্দকাঠি, কুমারখালী, ইউসুফপুর, কালিকাপুর সাপখালী, ঝুরঝুরিয়া, পুটিমারি, শুকরোখালী, ঝাউতলী, নিমতলী, সন্ন্যাসীর চক, বালিয়াডাঙ্গা, জালালতলা, সন্ধ্যার খাল, ঝপঝুপিয়া ও বাগারখালীসহ সকল খাল উন্মুক্ত হলে জলাবদ্ধতা দুর হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, খাল দখল এবং পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ার কারণে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ঠেকরা গ্রামের হারুন অর রশিদ বলেন, এলজিইডি একটি সড়ক নির্মাণের সময় প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ খালের পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে প্রতিবছর বর্ষায় বিস্তীর্ণ মৎস্যঘের তলিয়ে যায়, কৃষিজমিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং কৃষক ও মৎস্যচাষীরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
তারালী ইউনিয়নের গোলখালী গ্রামের আব্দুস ছাত্তার বলেন, কাঁকশিয়ালী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত সব খাল পুনঃখনন করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে আমিয়ান ও গোলখালী খাল পুনঃখনন করা হলে এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল হবে, কৃষিজমির জলাবদ্ধতা কমবে এবং মৎস্যচাষও নিরাপদ ও লাভজনক হবে।
ঘের ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী খান বলেন, খালগুলোর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ না থাকায় শুকনো মৌসুমে ঘেরে প্রয়োজনীয় পানি তোলা যায় না। আবার বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি বের হওয়ার পথ না থাকায় ঘের তলিয়ে মাছ ভেসে যায়। এতে প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
ফতেপুর গ্রামের শাহাদাৎ হোসেন বলেন, গলঘেষিয়া নদীর সঙ্গে সংযুক্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ খালের পানি প্রবাহ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় নদীটির স্বাভাবিক নাব্যতা ও প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সময়মতো খালগুলো পুনরুদ্ধার না করা হলে ভবিষ্যতে গলঘেষিয়া নদী আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে।
কালিগঞ্জের নদী-খাল নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করে আসছেন অ্যাডভোকেট জাফর উল্যাহ ইব্রাহিম। তিনি বলেন, একসময় কালিগঞ্জে শতাধিক খাল ছিল, যা আদি যমুনা, কাঁকশিয়ালী, গলঘেষিয়া, কালিন্দী ও সোনাইসহ পাঁচটি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। ঘের ব্যবস্থা চালুর আগে এসব খাল দিয়েই স্বাভাবিকভাবে পানি নিষ্কাশন হতো, ফলে ফসলি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দখল, ভরাট, অব্যবস্থাপনা এবং অবৈধ বন্দোবস্তের কারণে অধিকাংশ খালের অস্তিত্ব আজ সংকটের মুখে। অনেক খাল এখন আর খাল নেই, কোথাও মাছের ঘের করা হয়েছে, আবার কোথাও ভরাট করে দখল করা হয়েছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রতি বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে অবিলম্বে দখলমুক্ত করে খালগুলো পুনঃখনন এবং অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিল করা জরুরি।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কালিগঞ্জ পওর উপ-বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন সরদার বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কালিগঞ্জের ৩৩টি খালের তালিকা দিয়েছি। পর্যায়ক্রমে খনন করা হবে। পুরোনো রেগুলেটর ও স্লুইজ গেটগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারও করা হচ্ছে। সরকার যেহেতু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই ধাপে ধাপে জলাবদ্ধতা কমে আসবে বলে আমরা আশা করছি।

