
অধ্যাপক আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ : গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস বলেছিলেন, ‘আপনি একই নদীতে দুবার পা রাখতে পারবেন না।’ কারণ নদীর জল অনবরত বয়ে যায়, পরমুহূর্তেই তা নতুন রূপ নেয়। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনে এই দার্শনিক সত্যটি আজ এক ভয়ংকর ও নির্মম বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তারা চাইলেও তাদের শৈশবের সেই চেনা নদীতে আর পা রাখতে পারেন না। কারণ যে নদী একসময় তাদের জীবন ও জীবিকার স্পন্দন ছিল, তার সেই চিরায়ত স্রোত আজ আর নেই। সময়ের পরিক্রমায় নদী পাল্টেছে ঠিকই, তবে তা নতুন কোনো স্রোত নিয়ে নয়; বরং বছরের অর্ধেক সময় ধু-ধু বালুচর আর বাকি অর্ধেক সময় প্রলয়ংকরী বন্যার এক মরণফাঁদ হয়ে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই সফর ১৮ কোটি মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ, সীমিত সম্পদের বদ্বীপ রাষ্ট্রের জন্য বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির টেস্ট কেস। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রধান শর্ত হওয়া উচিত—কোনো আদর্শিক সংঘাত বা উসকানিমূলক বাগাড়ম্বরের ফাঁদে না পড়ে, সবার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ আদায়।
রিসোর্স ডিপেন্ডেন্সি থিওরি (Resource Dependency Theory) অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র যখন টিকে থাকতে অপরিহার্য কোনো সম্পদের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তার সার্বভৌম দরকষাকষির ক্ষমতা হ্রাস পায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই অপরিহার্য সম্পদটি হলো পানি। উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা তিস্তা নদী যুগ যুগ ধরে ঐতিহাসিক সংকটের মুখোমুখি।
বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের শুষ্ক মৌসুমের (ডিসেম্বর-এপ্রিল) পানি প্রবাহের রেকর্ড ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গজলডোবা ব্যারেজের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহারের ফলে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ যেখানে ৫,০০০ কিউসেক থাকার কথা, তা নেমে আসে মাত্র ৪০০ কিউসেকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তায়।
ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (IFPRI) এবং সাম্প্রতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থাগুলোর উপাত্ত অনুযায়ী, তিস্তা অববাহিকায় প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমের খরা এবং বর্ষা মৌসুমের আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে কয়েক হাজার কোটি টাকার আর্থিক ও ব্যাপক কাঠামোগত ক্ষতি হচ্ছে। প্রতি বছর নদীভাঙনের শিকার হয়ে প্রায় ৪০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয় এবং সর্বস্ব হারিয়ে শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নেয়। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর ও দারিদ্র্যের হারকে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খরা ও সেচের পানির অভাবে প্রতি বছর কেবল আমন ও বোরো ধানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে প্রায় ১৫ লক্ষ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ গত এক দশক ধরে এক বুক আশা নিয়ে প্রতীক্ষা করছে একটি স্থায়ী সমাধানের—যার নাম ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ বা ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’।
এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল কৌশলগত প্রাপ্তির দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক অনুদান নিশ্চিত হয়েছে। তবে বাণিজ্যের বিপণন কৌশল এবং কূটনীতির ভাষায় এই সফরের সবচেয়ে বড় অনন্য অর্জন বা ‘ইউএসপি’ (USP) হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের সরাসরি কারিগরি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের সুনির্দিষ্ট সম্মতি।
চীন এই মেগা প্রকল্পের কারিগরি সমীক্ষা দ্রুততম সময়ে শেষ করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা প্রকল্পটিকে কাগজের ফাইল থেকে বাস্তবে রূপান্তরের প্রথম অবধারিত ধাপ। বেইজিংয়ের এই বিশাল কারিগরি ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ, চীন ইতিমধ্যেই থ্রি গর্জেস ড্যামসহ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদী শাসন ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো অত্যন্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করে তাদের প্রকৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ারচায়না’ (PowerChina)-এর প্রাথমিক ফিজিবিলিটি স্টাডি (কারিগরি সমীক্ষা) রিপোর্ট এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (BWDB) মেগা প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই মহাপরিকল্পনায় রয়েছে ১১৫ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, নদীর দুই তীরে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ, ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার এবং সেই উদ্ধারকৃত জমিতে আধুনিক কৃষিখামার, সোলার এনার্জি পার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। বিপণন ও অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি উত্তরবঙ্গের পুরো সাপ্লাই চেইন এবং আঞ্চলিক জিডিপি-কে এক ধাক্কায় বদলে দেওয়ার মতো একটি ‘গেম চেঞ্জার’ প্রজেক্ট।
কিন্তু এই অর্থনৈতিক প্রাপ্তির ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণ। বাংলাদেশের এই তিস্তা পরিকল্পনা ও চীন সফর নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের নীতিনির্ধারক মহল এবং তাদের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে বেশ উদ্বেগজনক আলোচনা চলছে। দিল্লির এই কৌশলগত উদ্বেগের প্রধান কারণ ভূ-কৌশলগত অবস্থান। তিস্তা প্রকল্পের প্রস্তাবিত এলাকাটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সংযোগস্থলের অত্যন্ত নিকটবর্তী। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের শঙ্কা, এই প্রকল্পের আওতায় চীনের সম্ভাব্য কারিগরি উপস্থিতি তাদের ওই কৌশলগত সংযোগস্থলের জন্য এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
এই জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নব্য-বাস্তববাদের (Neo-realism) চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ারশেইমার তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য ট্র্যাজেডি অব গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, পরাশক্তিরা সবসময় নিজেদের প্রভাব বলয় বজায় রাখতে চায়, যেখানে ছোট বা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে অনেক সময় ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়। বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারে, কিন্তু ভৌগোলিক ও সামরিক দিক থেকে বৃহৎ শক্তিগুলোর তুলনায় আমাদের সমীকরণ ভিন্ন। তাই আমাদের এমন কোনো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত বা সামাজিক মাধ্যমে উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তৃতার ফাঁদে পড়ে কাউকে শত্রুভাবান্ন করে তোলা যাবেনা।
ভারত আমাদের তিন দিকের প্রতিবেশী, তাদের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর। আবার চীন আমাদের বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী এবং প্রযুক্তিগত পরাশক্তি। এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বে আমরা কোনো পক্ষের ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারি না। তাই নেগোসিয়েশন ও সহযোগীতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে আমাদের নীতি হবে অত্যন্ত সুবিবেচিত, পরিপক্ক এবং ভারসাম্যপূর্ণ।
বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকে আমাদের অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায়, শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে অবগত করতে হবে যে, তিস্তা প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে একটি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রকল্প; এর সাথে কৌশলগত বা সামরিক কোনো উদ্দেশ্য যুক্ত নয়। প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দিল্লির অমূলক ভীতি দূর করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নদী আইনের আওতায় আস্থা-নির্মাণমূলক পদক্ষেপ (Confidence Building Measures) গ্রহণ করতে পারে।
তবে একই সাথে, দিল্লির উদ্বেগের প্রতি প্রতিবেশীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে আমাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সুরক্ষার প্রশ্নে অটল থাকতে হবে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত পানি বণ্টন চুক্তির বাস্তবতায়, তিস্তা অববাহিকার ৫ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় নিজেদের সীমানার ভেতরে নদী শাসনের জন্য বিক০ল্প কারিগরি অংশীদারিত্ব গ্রহণ করা বাংলাদেশের জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ মাত্র।
আধুনিক কূটনীতি হলো সর্বোচ্চ প্রজ্ঞার সাথে জাতীয় সম্পদ ও ভূ-কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষার এক সুনিপুণ প্রয়াস। বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশীদার। তিস্তা মহাপরিকল্পনা তাই নিছক কোনো নদী শাসন প্রকল্প নয়; এটি ১৮ কোটি মানুষের বদ্বীপ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা। এই রূপরেখা বাস্তবায়নে পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বলয়ে নিঃশর্ত সমর্পণ কিংবা অপরিণামদর্শী কোনো কূটনৈতিক পদক্ষেপ—উভয় পথই বাংলাদেশের জন্য বর্জনীয়। বেইজিংয়ের কারিগরি সক্ষমতা এবং দিল্লির কৌশলগত উদ্বেগের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও সূক্ষ্ম কূটনৈতিক সেতুবন্ধন রচনা করতে হবে, যেখানে দিনশেষে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের, আমাদের কৃষকের এবং আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা; পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

