
মোঃ কামাল উদ্দীন : চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন মুরাদপুরের ফরেস্ট গেইট এলাকায় ২৫ বছর বয়সী মো. আজাদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনাটি নগরজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি হত্যাকাণ্ড হলেও, ঘটনাটির পেছনে কী ঘটেছিল এবং কী কারণে এমন পরিণতি—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও তদন্তাধীন।
ঘটনার দিন বিকেলে এই প্রতিবেদকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে গুলির খবর আসে। প্রাথমিক তথ্য যাচাই করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম সংবাদ প্রকাশ করা হয় যে, গুলিতে আজাদ নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এরপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ঘটনাটি প্রচার করে। পরবর্তী সময়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ঘটনার নেপথ্য জানার চেষ্টা করে দৈনিক সাতনদী।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আজাদ, ইসহাক ও হৃদয় নামে তিনজন একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতরে ছিলেন। তদন্তে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে, সেখানে কোনো এক পর্যায়ে বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং হৃদয় আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আজাদকে গুলি করেন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আজাদকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হৃদয় বর্তমানে পলাতক এবং তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ইসহাককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ঘটনার পর হাসপাতালে নেওয়ার সময় প্রথমে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল—আজাদকে নাকি রাস্তার পাশে হাঁটার সময় অজ্ঞাত ব্যক্তি গুলি করেছে—তদন্তে তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (পাঁচলাইশ জোন) জানিয়েছেন, গুলির ঘটনা পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতরেই ঘটেছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনাস্থলের পরিত্যক্ত বাড়িগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, সেখানে প্রায়ই অপরিচিত ব্যক্তিদের যাতায়াত দেখা যায় এবং রাতের বেলায় আড্ডা বসে। কেউ কেউ মাদকসেবন ও অন্যান্য অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদনের পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি এবং বিষয়গুলো তদন্তসাপেক্ষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বাসিন্দা দাবি করেন, তিনি নিজের বাসার জানালা থেকে ঘটনার কিছু অংশ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিহত আজাদ ও কয়েকজন যুবককে অতীতেও ওই এলাকায় একাধিকবার দেখা গেছে। তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার দিন কয়েকজন নারীও ওই এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন এবং তাঁর বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসীর অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যদি পরিত্যক্ত বাড়িগুলো দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের আড্ডাস্থল হয়ে থাকে, তবে সেগুলো নিরাপত্তার আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের মতে, এমন স্থানে নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা সহজ হতে পারে।
এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কেন আজাদকে গুলি করা হলো? ঘটনাস্থলে ঠিক কারা উপস্থিত ছিলেন? বিরোধের প্রকৃত কারণ কী? পলাতক হৃদয়কে গ্রেপ্তারের পর এসব প্রশ্নের উত্তর আরও পরিষ্কার হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
দৈনিক সাতনদী মনে করে, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটন শুধু একটি হত্যার বিচার নিশ্চিত করার জন্য নয়; বরং জননিরাপত্তা, পরিত্যক্ত স্থাপনার ব্যবহার এবং সম্ভাব্য অপরাধপ্রবণ পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তব চিত্র সামনে আনার জন্যও জরুরি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে—এটাই প্রত্যাশা।

