
মো. কামাল উদ্দিনঃ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর অবস্থিত কালুরঘাট ফেরিঘাট শুধু একটি ইজারাকৃত সরকারি সম্পদ নয়; এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। দীর্ঘদিন ধরে বোয়ালখালী, চাঁন্দগাঁও, পটিয়া, রাঙ্গুনিয়া ও দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ এই ফেরির ওপর নির্ভর করে চলাচল করে আসছেন। ফলে এই ফেরিঘাটকে ঘিরে যে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সরাসরি জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সম্প্রতি এই ফেরিঘাটের ইজারা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, ইজারা সংক্রান্ত বিষয়টি বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে বলে বর্তমান ইজারাদার প্রতিষ্ঠান আমরিন এন্ড ব্রাদার্স দাবি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, Writ Petition No. 5977 of 2026-এ আদালত Rule Nisi জারি করেন এবং সংশ্লিষ্ট ইজারা কার্যক্রমের ওপর ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ প্রদান করেন। এমন পরিস্থিতিতে একই ইজারা নিয়ে পুনরায় দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা, আইনি অবস্থান এবং জনস্বার্থের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সংকটের সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ
আমরিন এন্ড ব্রাদার্সের দাবি, তারা এমন এক সময়ে কালুরঘাট ফেরিঘাটের ইজারা গ্রহণ করে, যখন কালুরঘাট সেতু সংস্কারের জন্য দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ ছিল। সেই সময় ফেরিই ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের একমাত্র নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের মাধ্যম। অনেক ব্যবসায়ী সম্ভাব্য লোকসান, অনিশ্চয়তা ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে এই ইজারা নিতে আগ্রহী ছিলেন না।
প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, তারা এই ইজারাকে কেবল ব্যবসার দৃষ্টিতে দেখেনি; বরং এটিকে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ব্যবসায়িক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, সেই লক্ষ্যেই তারা ফেরি চলাচল সচল রেখেছে।
লোকসানের মধ্যেও সেবা অব্যাহত রাখার দাবি
প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, গত তিন বছরে তারা ধারাবাহিকভাবে আর্থিক লোকসান বহন করেছে। কালুরঘাট সেতু পুনরায় চালু হওয়ার পর ফেরির যাত্রী ও যানবাহনের সংখ্যা কমে যায়। এর পাশাপাশি জোয়ার-ভাটার প্রভাব, পন্টুন ও গ্যাংওয়ের কারিগরি ত্রুটি, নদীর নাব্যতার পরিবর্তন, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা ফেরি পরিচালনাকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে।
এ ছাড়া হামলার ঘটনায় সিসিটিভি, ডিভিআর এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা সরকারের নির্ধারিত ইজারার কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ এবং জনসেবা অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছে।
বিচারাধীন বিষয় ও প্রশাসনিক প্রশ্ন
ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের দাবি, আদালতের আদেশ পাওয়ার পর তারা লিখিতভাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে অবহিত করে। পরে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে লিখিত জবাবও দেয়। কিন্তু তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই জবাব বিবেচনার আগেই দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়।
এই দাবি সত্য হলে প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি—সংশ্লিষ্ট পক্ষকে পূর্ণাঙ্গভাবে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া—নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
জনস্বার্থের বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ
কালুরঘাট ফেরিঘাট কোনো সাধারণ ইজারা নয়। এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ—সবাই এর প্রভাব অনুভব করেন।
এই বাস্তবতায় ফেরিঘাট পরিচালনার ধারাবাহিকতা, নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আদালতের বিচারাধীন একটি বিষয়ে এমন কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ, যা পরবর্তীতে নতুন জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে, তা নিয়ে সতর্ক আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
প্রশাসনের প্রতি প্রত্যাশা
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত শুধু আইনসম্মত হলেই যথেষ্ট নয়; সেটি যেন ন্যায়সঙ্গত, স্বচ্ছ এবং জনআস্থার উপযোগীও হয়। বিচারাধীন বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সংযম অনেক সময় আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
যদি কোনো পক্ষ মনে করে তাদের বক্তব্য যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি, তবে প্রশাসনের দায়িত্ব হবে তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন হলে আইনগত পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
সরকারের সুদৃষ্টি কামনা
দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা—এই ইস্যুতে কোনো পক্ষ যেন অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং জনগণের স্বার্থ যেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা এবং প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় দরপত্রের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা জনস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত হতে পারে।
একই সঙ্গে, যদি আমরিন এন্ড ব্রাদার্সের আর্থিক ক্ষতি, জনসেবামূলক অবদান এবং অন্যান্য দাবিগুলো নথিপত্র দ্বারা সমর্থিত হয়, তবে সেগুলোও ন্যায়সংগতভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। যারা প্রতিকূল সময়ে জনসেবা সচল রাখার দায়িত্ব পালন করেছে বলে দাবি করছে, তাদের বক্তব্যও নিরপেক্ষভাবে শোনা এবং যাচাই করা একটি দায়িত্বশীল প্রশাসনের অংশ।
কালুরঘাট ফেরিঘাটের এই বিরোধ একটি সাধারণ ইজারা বিরোধের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি জনস্বার্থ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের প্রতি সম্মান—এই চারটি মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের। তবে আদালতের রায় না আসা পর্যন্ত এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, যা জনআস্থা অক্ষুণ্ন রাখে, অপ্রয়োজনীয় বিরোধ সৃষ্টি না করে এবং জনগণের ভোগান্তি কমায়। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ প্রত্যাশা করে—এই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, তা হবে আইন, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং সর্বোপরি জনস্বার্থের ভিত্তিতে।

