
স্টাফ রিপোর্টার:সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিজ কাউসার আজিজ বলেছেন, একটি বাল্যবিবাহ শুধু একটি মেয়ের শৈশব কেড়ে নেয় না, তার শিক্ষাজীবন, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। সচেতনতার অভাবেই সমাজে এখনো বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন সাইবার বুলিং ও নারী পাচারের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে সম্মিলিত সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, বাল্যবিবাহ, সাইবার বুলিং, নারী নির্যাতন কিংবা নারী পাচারকে আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং একই ধরনের সামাজিক অপরাধের ধারাবাহিক রূপ। একটি অপরাধকে প্রশ্রয় দিলে অন্য অপরাধও বিস্তারের সুযোগ পায়। তাই কোনো অন্যায় দেখলে নীরব না থেকে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
সোমবার দুপুরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাল্যবিবাহ, সাইবার বুলিং, নারী নির্যাতন ও নারী পাচারসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে আয়োজিত সচেতনতামূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, সাতক্ষীরা জেলা কার্যালয় এ সভার আয়োজন করে।
জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, একটি মেয়েকে বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি পরিবারকে রক্ষা করা নয়; বরং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। এজন্য অভিভাবকদের সন্তানদের মতামত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের কারণে কিশোরী ও নারীরা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সাইবার বুলিংয়ের কারণে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অনলাইনে কোনো ধরনের হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হলে দ্রুত পরিবার, শিক্ষক ও প্রশাসনকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। বাল্যবিবাহ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা চোখের সামনে ঘটলেও যারা নীরব থাকেন, তারাও পরোক্ষভাবে অপরাধকে উৎসাহিত করেন। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত বলেন, বাল্যবিবাহ ও সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধ সামাজিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হতে হবে। কোথাও বাল্যবিবাহের আয়োজন কিংবা নারী নির্যাতনের ঘটনা জানতে পারলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান রয়েছে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে।
সভায় পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, সাইবার বুলিং, নারী নির্যাতন ও নারী পাচারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাজমুন নাহার।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির প্রসার মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহারে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা ও নারীদের বিভিন্নভাবে হেনস্তার ঘটনাও বাড়ছে। নারী ও কিশোরীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিয়মিত সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
সভায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষকবৃন্দ, ইউপি সদস্য এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
উল্লেখ্য, অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরায় একদিনে ১৩টি বাল্যবিবাহের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। এমন প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। সচেতনতামূলক সভায় উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, সাইবার বুলিং ও নারী পাচারসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

