
বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছর শেষ করে একজন শিক্ষার্থী যখন স্নাতকের সনদ হাতে পান, তখন তাঁর বাস্তব কাজের দক্ষতা কতটুকু থাকে? উত্তরটি ‘শূন্য শতাংশ’।
সনদের পেছনে ছুটতে গিয়ে পুঁথিগত বিদ্যার চাপে শিক্ষার্থীর ‘আসল শিখন’ (Key Takeaway) শূন্যেই থেকে যায়। সৃজনশীলতা ও কর্মবাজারের সাথে সম্পর্কহীন শতাব্দী প্রাচীন পুরোনো সিলেবাসের মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা তরুণদের আটকে রেখেছি। অথচ আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শিল্প খাতের প্রয়োজন-উদ্ভাবক, দক্ষ হাত এবং বাস্তবমুখী সমাধান।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এই রূঢ় বাস্তবতা এবং তা থেকে উত্তরণের পথবিনির্মাণই ছিল গত ১৬ জুলাই ‘কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিতে চাই অভিন্ন পাঠক্রম’ শিরোনামে প্রকাশিত আমার কলামটির মূল বিষয়বস্তু। লেখাটি প্রকাশের পর শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিভিন্ন মহলে ইতিবাচক সাড়া প্রমাণ করেছে, তারুণ্যের অপচয়কারী এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তারা কতটা উন্মুখ।
চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষার বড় ধরনের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ১,৪২৮টি স্নাতক প্রোগ্রাম বাতিল করে এবং একই সঙ্গে শিল্প ও প্রযুক্তির চাহিদাভিত্তিক নতুন বহু প্রোগ্রাম চালু করে। এ সংস্কারের লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, জাতীয় উন্নয়ন কৌশল ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা এবং উচ্চশিক্ষাকে বাস্তবমুখী ও উদ্ভাবনকেন্দ্রিক করে তোলা।
পাশাপাশি গবেষণার মূল্যায়নে প্রথাগত থিসিসের পাশাপাশি পণ্য উদ্ভাবন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্প-সহযোগিতা ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পেটেন্টের মতো বাস্তব অর্জনকে ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও শিল্প প্রতিযোগিতার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করছে।
আমাদেরও সেই সাহসিকতা দেখাতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত কেবল মাতৃভাষা বাংলা ও মৌলিক জ্ঞানচর্চাই যথেষ্ট; সাহিত্য বা দর্শন কারও আগ্রহের বিষয় হলে তা ঐচ্ছিক হিসেবে পড়ার সুযোগ থাকবে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা-সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কূটনীতি ও করপোরেট যোগাযোগের চাহিদা বিবেচনায় একটি সমন্বিত ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড গ্লোবাল কমিউনিকেশন স্কুল’-এর অধীনে পুনর্গঠন করা যেতে পারে। এতে বিদ্যমান গবেষণা ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন অক্ষুণ্ণ রেখে ভাষা শিক্ষাকে বাস্তব প্রয়োগ, আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে।
আমাদের প্রস্তাবিত বাস্তবমুখী শিক্ষার এই রূপান্তরকে ‘তিন ধাপের ডিপ্লোমা মডেল’ হিসেবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যার শুরুটা হবে উচ্চমাধ্যমিক স্তর থেকেই। প্রচলিত এইচএসসি নামের পরিবর্তে এটি হবে শিক্ষার্থীর ‘ফার্স্ট ডিপ্লোমা’ (First Diploma)। এ পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতার এমন সমন্বয় ঘটানো হবে, যেন কোনো শিক্ষার্থী পারিবারিক বা আর্থিক কারণে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়লেও তার হাতে একটি সম্মানজনক ডিগ্রির পাশাপাশি ওয়েল্ডিং, কার্পেন্ট্রি বা মেকানিকসের মতো বাস্তব কাজের দক্ষতা থাকে। ফলে তাকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য নতুন করে চার বছরের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং করতে হবে না এবং তার মূল্যবান সময়ের সাশ্রয় হবে।
এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের প্রথম দুই বছর হবে। ‘সেকেন্ড ডিপ্লোমা’ (Second Diploma), যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রোগ্রেসিভ ইনোভেশনের সঙ্গে তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয় ঘটাবেন। আর শিক্ষার চূড়ান্ত রূপান্তর ঘটবে তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে, যাকে আমরা বলছি ‘স্নাতক’ (Bachelor)।
এটি মূলত একটি নিবিড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাপ্রেন্টিসশিপ; যেখানে তৃতীয় বর্ষে শিক্ষার্থীরা সরাসরি কোনো শিল্পকারখানায় প্রশিক্ষণ নেবেন এবং চতুর্থ বর্ষে সেই কারখানাতেই পূর্ণকালীন শিল্প-সংযুক্ত অ্যাপ্রেন্টিসশিপে অংশ নেবেন। চূড়ান্ত সনদ পাওয়ার জন্য তাঁদের শিল্প খাতের বাস্তব সমস্যার সমাধান ও উদ্ভাবনের ওপর একটি ‘উদ্ভাবন প্রতিবেদন’ (Innovation Report) জমা দিয়েই তাঁরা গ্র্যাজুয়েট হবেন।
এই ইন্ডাস্ট্রি-ইন্টিগ্রেটেড মডেলটি বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাঠামোতেও আধুনিকায়ন অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই ধরনের শিক্ষক থাকবেন-একদল তত্ত্বীয় বিষয়গুলো পড়াবেন এবং অন্যদল হবেন করপোরেট ও জব মার্কেটের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং ‘ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্ট’; যাঁরা শিক্ষার্থীদের সরাসরি বাস্তব জগতের সঙ্গে পরিচয় করাবেন। তবে এই রূপরেখার সবচেয়ে বড় চমক ও আর্থিক বিপ্লবটি লুকিয়ে আছে শেষ দুই বছরের ‘টিউশন ফি’ Split বা বিভাজনের মধ্যে।
যখন একজন শিক্ষার্থী তাঁর স্নাতক সম্পন্ন করতে ইন্ডাস্ট্রিতে যাবেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ৪০ শতাংশ পাবে বিশ্ববিদ্যালয়, কারণ একজন একাডেমিক সুপারভাইজার শিক্ষার্থীর মান নিয়ন্ত্রণ করবেন। আর বাকি ৬০ শতাংশ বরাদ্দ থাকবে সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্রির জন্য, যেখানে শিক্ষার্থীর ক্লাস, ল্যাব ও প্রশিক্ষণ পরিচালিত হবে।
সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয় হলো, শিক্ষার্থীকে এই ৬০ শতাংশ টিউশন ফি পরিশোধ করতেই হবে না; বরং শিল্পকারখানায় কাজ করার সুবাদে ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে উল্টো ‘ইন্টার্নশিপ ফি’ বা ভাতা প্রদান করবে। এর ফলে শিক্ষার্থীর শিক্ষাব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে সাশ্রয় হবে এবং পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জন নিশ্চিত হবে-যা তরুণদের জন্য একই সঙ্গে ‘আর্থিক স্বস্তি’ ও ‘বাস্তব দক্ষতা’ অর্জনের এক যুগপৎ সুযোগ।
উক্ত মডেল জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে একটি সুচিন্তিত ‘ক্লিন-কাট’ রূপরেখা। এই শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীর কারিগরি জ্ঞান ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বাড়িয়ে তাকে চাকরির বাজারে দক্ষ করে তুলবে এবং তার উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। ফলে সে নিজে কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে একজন উদ্ভাবনী উদ্যোক্তায় রূপান্তরিত হবে। শিক্ষাকে সরাসরি শিল্পকারখানার সঙ্গে যুক্ত করলে আমাদের এই বিশাল তরুণ প্রজন্ম যুগান্তকারী পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
- অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ শিক্ষা ও শিল্প উদ্যোক্তা; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ–এর ডিরেক্টর ও নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান।

