
সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা জেলার পৌর এলাকা (যেমন: সুলতানপুর, ইটাগাছা, কাটিয়া, কদমতলা) এবং উপজেলা সদরগুলোতে ‘কিশোর গ্যাং’-এর তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মূলত ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সী কিশোর-যুবকরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করছে। স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের উত্যক্ত করা, তুচ্ছ ঘটনায় দলবেঁধে মারামারি, স্থানীয় দোকানে চাঁদাবাজি, মোটরসাইকেলে বেপরোয়া মহড়া এবং মাদক সেবন ও কারবারের সাথে এরা জড়িয়ে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়া (যেমন: ফেসবুক গ্রুপ, টিকটক, রিলস) ব্যবহার করে দলগত পরিচিতি তৈরি ও আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা তাদের অপরাধপ্রবণ করে তুলছে।
কিশোর গ্যাং বৃদ্ধির মূল কারণসমূহ:
পারিবারিক সচেতনতার অভাব: অভিভাবকদের অপ্রতুল তদারকি এবং সন্তানদের চলাফেরায় খেয়াল না রাখা।
মাদক ও অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনের অপব্যবহার: সীমান্ত এলাকা হওয়ার কারণে সাতক্ষীরায় মাদকের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি ফ্যান্টাসি তৈরি হওয়া।
রাজনৈতিক ও স্থানীয় বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়: স্থানীয় প্রভাবশালী ও তথাকথিত ‘বড় ভাই’দের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করা।
বিনোদনের অভাব: খেলার মাঠের অভাব এবং সুস্থ সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চার ঘাটতি।
সাতক্ষীরায় কিশোর গ্যাং উত্তরণে করণীয় ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে শুধুমাত্র আইনি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও বহুমুখী পরিকল্পনা।
প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ
১. শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, স্কুল-কলেজের সীমানা এলাকা, পার্ক ও নির্জন স্থানগুলোতে নিয়মিত পুলিশি টহল ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো।সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কিশোরদের মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেওয়া বন্ধ করা।
২. সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ কর্তৃক এলাকার চিহ্নিত গ্যাংগুলোর তালিকা তৈরি করা এবং তাদের নেতৃত্বদাতাদের (তথা তথাকথিত ‘বড় ভাই’) চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।
৩. সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা হওয়ায় সাতক্ষীরায় মাদকের সরবরাহ বন্ধে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের সহায়তায় মাদকবিরোধী জিরো-টলারেন্স অভিযান জোরদার করা।
পারিবারিক ও সামাজিক পদক্ষেপ
১.সন্তান রাতে কখন বাড়ি ফিরছে, কার সাথে মিশছে এবং অতিরিক্ত অর্থের ব্যবহার করছে কি না—তা নিয়মিত তদারকি করা।
সন্তানকে ডিভাইসমুক্ত রাখতে পরিবারে গুণগত সময় দেওয়া।
২.প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে ‘কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা, যেখানে শিক্ষক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, কাউন্সিলর/ইউপি সদস্য ও অভিভাবকরা যুক্ত থাকবেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ
১.সাতক্ষীরার স্কুল-কলেজগুলোতে নিয়ম করে কিশোর অপরাধ ও মাদকের কুফল সংক্রান্ত সচেতনতামূলক ওয়ার্কশপ এবং কাউন্সেলিং সেশনের আয়োজন করা।
২.সাতক্ষীরা স্টেডিয়াম, জেলা পরিষদ মাঠ এবং বিভিন্ন বিদ্যালয় মাঠে নিয়মিত টুর্নামেন্টের আয়োজন করা এবং কিশোরদের জেলা শিল্পকলা ও স্কাউটিং কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করা।
সংশোধনমূলক ও সাইকোলজিক্যাল পদক্ষেপ
প্রথমবার অপরাধে জড়িতদের সরাসরি অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে প্রবেশন (Probation) এবং মানসিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর সুযোগ সৃষ্টি করা।
উপসংহার:
কিশোর গ্যাং কোনো স্থায়ী সমস্যা নয়; বরং এটি সামাজিক অসচেতনতা ও ভুল দিকনির্দেশনার ফসল। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষক, অভিভাবক ও সুশীল সমাজের সুসংগঠিত এবং ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপই পারে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে একটি নিরাপদ ও শান্তিময় সাতক্ষীরা গড়ে তুলতে।
প্রতিবেদক: মোঃ মাসুদ রানাএমএসসি ( পদার্থ বিজ্ঞান)

