
মেহেদী হাসান: হাসপাতাল আছে, চিকিৎসকও আছেন কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রটি চালু হয় না। কোথাও এক্স-রে বন্ধ, কোথাও আলট্রাসনোগ্রাম, আবার কোথাও ইসিজি কিংবা অ্যানেসথেশিয়া মেশিন পড়ে আছে অচল হয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্টসহ প্রয়োজনীয় জনবলের বড় ঘাটতি। ফলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগীকেই শেষ পর্যন্ত যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিকে।
খুলনার নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘিরে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। জেলার প্রত্যন্ত এলাকার স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এসব হাসপাতালই ছিল কম খরচে চিকিৎসার প্রধান আশ্রয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রোগ নির্ণয় যখনই থমকে যাচ্ছে, তখন সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল মানুষকে বাড়তি টাকা খরচ করে ছুটতে হচ্ছে বাইরে।খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট অনুমোদিত পদ ১ হাজার ৭৭৭টি। এর মধ্যে ৭৫৮টি পদই শূন্য। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক জনবল ছাড়াই চলছে উপজেলা পর্যায়ের এই চিকিৎসাব্যবস্থা।সবচেয়ে বেশি জনবল ঘাটতি পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে ২৫০টি পদের মধ্যে ১২৪টি পদ শূন্য। দাকোপে ২১৪ পদের ৮৭টি, বটিয়াঘাটায় ১৪২ পদের ৫৬টি, রূপসায় ১৭২ পদের ৭৬টি, তেরখাদায় ১৭৫ পদের ৮৪টি, দিঘলিয়ায় ১৮৩ পদের ৭৩টি, ফুলতায় ১৬২ পদের ৪৯টি, ডুমুরিয়ায় ২৭৮ পদের ১০৮টি এবং কয়রায় ২০১ পদের ১০১টি পদে লোক নেই।শুধু অনুমোদিত পদ খালি থাকার হিসাবেই সমস্যার শেষ নয়। কোনো কোনো হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যেও কেউ প্রেষণে, কেউ অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত, আবার কেউ অন্য প্রতিষ্ঠানে সংযুক্ত রয়েছেন।দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাঁচজন চিকিৎসক অন্যত্র প্রেষণে রয়েছেন। দিঘলিয়ায় একজন চিকিৎসক অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত এবং একজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে সংযুক্ত। পাইকগাছা ও তেরখাদায়ও একজন করে চিকিৎসক অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত রয়েছেন।এর পাশাপাশি অধিকাংশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই আবাসিক মেডিকেল অফিসার, অ্যানেসথেশিয়া, সার্জারি, গাইনি, শিশু, চর্ম ও যৌন এবং চক্ষু বিভাগের প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নেই। ফলে হাসপাতালের দরজা খোলা থাকলেও সব ধরনের চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকছে না।পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্রটি সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট করে। হাসপাতালটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে অনেক সময় ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১২০ থেকে ১৫০ জনে। কিন্তু এই বিপুল রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই।পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানারা বিনতে আহমেদ বলেন, মেডিসিন, সার্জারিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের মেডিকেল অফিসার পদে কোনো চিকিৎসক না থাকায় সংশ্লিষ্ট রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি আরেকটি নীরব সংকট তৈরি করেছে অচল চিকিৎসা সরঞ্জাম। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি হাসপাতালে থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি অকেজো যন্ত্রপাতি রয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে অচল হয়ে পড়ে আছে মোট ১৬টি যন্ত্র ও সরঞ্জাম। এর মধ্যে রয়েছে একটি এক্স-রে, দুটি ইসিজি, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম, দুটি অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, দুটি মাইক্রোস্কোপ, একটি অটোক্লেভ, দুটি ডেন্টাল ইউনিট, একটি ডায়াথারমি মেশিন, দুটি জেনারেটর ও একটি অ্যাম্বুলেন্স।দিঘলিয়ায় অকেজো একটি মাইক্রোস্কোপ, একটি ইসিজি ও একটি অ্যাম্বুলেন্স। তেরখাদায় দুটি অ্যাম্বুলেন্স, একটি এক্স-রে, তিনটি ইসিজি, একটি আলট্রাসনোগ্রাম, একটি অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, দুটি ডেন্টাল ইউনিট ও একটি জেনারেটর অচল।
অকেজো সরঞ্জামের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই কোনো না কোনোভাবে ইসিজি, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও অ্যানেসথেশিয়া সেবায় সংকট রয়েছে।ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছিলেন রামকৃষ্ণপুর গ্রামের ৬৯ বছর বয়সী ফুলমতি রায়। চিকিৎসক তাঁর ব্যবস্থাপত্রে আলট্রাসনোগ্রাম করার পরামর্শ দেন। কিন্তু হাসপাতালের যন্ত্র চালু না থাকায় পরীক্ষা করাতে তাঁকে নিয়ে যেতে হয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে।
ফুলমতি রায়ের ছেলে পঞ্চরাম বলেন, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর সুযোগ না থাকায় তাঁদের অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়েছে। শুধু অর্থ নয়, বৃদ্ধ মাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে দূরের ক্লিনিকে যাতায়াত করতেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।উপকূলীয় কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংকট আরও প্রকট। সেখানে বর্তমানে কোনো টেকনিশিয়ান না থাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রেজাউল করিম।জরুরি রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে খুলনা শহরে নিতে হয়। কিন্তু হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক না থাকায় সেটিও নিয়মিত কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অর্থাৎ রোগীকে শুধু চিকিৎসার জন্য নয়, রোগ নির্ণয় ও পরিবহনের জন্যও উপজেলা পর্যায়ের বাইরে তাকাতে হচ্ছে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেন গ্রামের দরিদ্র, দিনমজুর ও কৃষক শ্রেণির মানুষ। তাঁদের অনেকের পক্ষেই জেলা শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকে, তাহলে সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার পরও মানুষকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার খরচ বেড়ে গিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে।
জনবল সংকটের বিষয়ে খুলনা সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা বেগম বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য চেষ্টা চলছে। অচল যন্ত্রপাতির তালিকা তৈরি করে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে নির্দেশনা পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

