
সিরাজুল ইসলাম,শ্যামনগর: জরুরি সেবার আওতায় থাকা অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেট কার ও ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ব্যবহার করে পাম্প থেকে তেল নিয়ে তা কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এসব যানবাহনের চালকরা জেলার বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দিনব্যাপী তেল সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো আড়াই শ থেকে ৩৫০ টাকা লিটার দামে বিক্রি করেন। লাভবান হওয়ায় ভাড়ায় চালিত অনেক মোটরসাইকেলচালক এখন যাত্রী না টেনে তেল বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন।
এসব তেলের ক্রেতারা বলছেন, দীর্ঘ সময় পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে তারা বাইরে থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের একাধিক চক্র তেলের সংকট শুরুর পর থেকে এসব অপকর্ম করে আসছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে জরিমানা করা হয়েছে।
জানা গেছে, একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রতিদিন তিন থেকে চারটি ফিলিং স্টেশন থেকে প্রায় ছয় থেকে ৯ হাজার টাকার তেল সংগ্রহ করে। পরে বিশেষ কৌশলে ট্যাংক থেকে তেল বের করে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। এসব তেল প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে, যা সাধারণ বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি।
শ্যামনগর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল স্ট্যান্ডের পাশের কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগে মোটরসাইকেলচালকরা প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করতেন। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই সেই পেশা ছেড়ে তেল বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
তারা জানিয়েছেন, একজন চালক ফিলিং স্টেশন থেকে প্রতিবার ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা তেল সংগ্রহ করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে তারা দেড় থেকে ২ হাজার টাকার তেল জোগাড় করছেন। পরে সেই তেল প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা দামে বিক্রি করছেন।
কথা হয় খোলাবাজার থেকে তেল কেনা কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে। তারা বলছেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে বেশি দামে তেল কেনা ভালো। আটুলিয়া ইউনিয়নের ছোটকুপট এলাকার চিংড়ির পোনা ব্যবসায়ী আব্দুল হাই সিদ্দিকী বলেন, ‘ব্যবসায়িক কারণে প্রতিদিন মোকামে যেতে হয়। আমার কাছে সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাম্পে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাই কাজ বাদ দিয়ে সময় নষ্ট করার চেয়ে আমি বাইরে থেকে তেল কিনি।’
কোন জায়গা এবং কার কাছ থেকে তেল কেনেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নাম বলা যাবে না। নাম বললে আমি আর সেখান থেকে তেল পাব না।’ তবে তিনি তাদের এলাকার এক মোটরসাইকেলচালকের কাছ থেকে তেল কেনেন বলে জানান।
শ্যামনগর পৌর এলাকার জে সি কমপ্লেক্সের এক কাপড় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘পাম্পে গেলে অনেক সময় তেল পাওয়া যায় না। কিন্তু বাইরে মোটরসাইকেলচালকদের মাধ্যমে সহজেই তেল পাওয়া যায়। তাই বাধ্য হয়েই ওই দিকেই যেতে হচ্ছে।’
জানা গেছে, গত ৩০ মার্চ রাত দশটার দিকে শ্যামনগর পৌরসভার চন্ডিপুর এলাকায় একটি প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স চালকের বাড়ির সামনে মোটরসাইকেল গ্যারেজে অভিযান চালানো হয়। এ সময় একটি তেল বিক্রির সময় হাতেনাতে আটক করা হয় প্রাইভেটকারচালকসহ দুইজনকে। অভিযানের নেতৃত্ব দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক।
পরে ভোক্তা অধিকার আইনে মাইক্রোবাস চালক হযরত আলীকে ৫ হাজার টাকা এবং গ্যারেজ মালিক মোহিতলাল মন্ডলকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। হযরত আলীর দেওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সচালক উৎপল মণ্ডলসহ একটি চক্র ফিলিং স্টেশন থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তেল সংগ্রহ করে তাদের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকে।
তবে অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে অ্যাম্বুলেন্সচালক উৎপল মণ্ডল বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ডে আমি জড়িত নই। কেউ যদি ফাঁসাতে আমার নাম বলে তাহলে কি আমি দোষী হবো?’ তিনি দাবি করেন, ‘আমার গাড়ি গ্যাসে চলে।’ অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে পাম্প থেকে কেন তেল কেনেন এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সকালে গাড়ি চালু করতে তেল প্রয়োজন হয়। তাই একটু তেল লাগে। তবে আমি তেল নিয়ে বিক্রি করি না।’
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক জানান, এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। উপজেলাজুড়ে অসাধু তেল মজুদকারী ও কালোবাজারিদের শনাক্ত করতে সোর্স কাজ করছে। এছাড়াও এই অপরাধমূলক কাজে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

