
গাজী হাবিব, সাতক্ষীরা:সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ জন শিক্ষক থাকলেও ক্লাস নেন পিওন! এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে সরেজমিনের অনুসন্ধানে। এই পিওন শুধু ক্লাসই নেন না, স্কুলের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণও করে। বলা যায় এই পিওনকে দিয়ে স্কুল নিয়ন্ত্রণ করানো হয়। বলছি- সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ৫৫ নং দক্ষিণ দেবনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিওন আসাদুল ইসলামের কথা । তাছাড়া এ স্কুলে রয়েছে আরো অনেক সমস্যা।
বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক, স্থানীয় সচেতন মহল ও শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। অনেকেই বলছেন, এটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের অনিয়ম নয়, বরং প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্যেও উদ্বেগজনক।
কয়েকজন অভিভাবকের মৌখিক অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দক্ষিণ দেবনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলে সরেজমিনে উঠে আসে আরো অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রেকডিং না করার শর্তে যার সবকিছুই অকপটে স্কীকার করেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক জোছনা আরা।
জানা গেছে, বিদ্যালয়ে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত ৮ জন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও যখন কোন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকেন তখন পিয়নের মাধ্যমে ক্লাস করানো হয়। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়াও স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ও পিয়নকে প্রায়ই অফিস চলাকালীন সময় বিদ্যালয়ের বাইরে মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। অনেক সময় তারা দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। এ বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
তাছাড়া, অভিযোগ রয়েছে অফিস চলাকালীন সময়েও কিছু কিছু দিন পিয়নকে লুঙ্গি পরে বিদ্যালয়ে আসতে দেখা গেছে। যা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও শৃঙ্খলার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরেজমিনে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোমলমতি শিশুদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষকদের। সেখানে পিয়নের মাধ্যমে ক্লাস পরিচালনার ঘটনা অত্যন্ত হতাশাজনক। তারা বলেন, সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও মাঠপর্যায়ে কিছু শিক্ষকের দায়িত্বহীনতার কারণে সেই সুফল ব্যাহত হচ্ছে।
একজন অভিভাবক বলেন, আমরা সন্তানদের ভালো শিক্ষা গ্রহণের আশায় বিদ্যালয়ে পাঠাই। কিন্তু শিক্ষক থাকার পরও যদি পিয়ন ক্লাস নেয়, তাহলে শিশুদের শিক্ষাজীবন কীভাবে গড়ে উঠবে? এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর অভিভাবক বলেন, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। মাঝে মধ্যেই এমন হচ্ছে। শিশুরা বাড়ি এসে বলে স্যার-ম্যাডামের বদলে ভাইয়া ক্লাসে থাকে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করুক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, স্যার বা ম্যাডাম থাকলেও মাঝে মধ্যে ভাইয়া আমাদের ক্লাস নেন। আরেক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, সরকার শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছে পাঠদান করানোর জন্য। সেখানে শিক্ষক উপস্থিত থেকেও যদি পিয়নকে ক্লাসে পাঠানো হয়, তাহলে এটি দায়িত্বে অবহেলা ছাড়া কিছু নয়।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা জোছনা আরার কাছে- অষ্টম শ্রেণী টাস পিয়ন ক্লাস নিতে পারেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে কোনো শিক্ষক অসুস্থ থাকলে বা কোনো কারণে অনুপস্থিত থাকলে পিয়ন ক্লাস নিতে পারেন। আপনার স্কুলের পিওন ক্লাস নেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক জোছনা আরা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন যে- ম্যাডামরা ছুটিতে বা অন্য কোন কারণে বাইরে থাকায় এক-দুদিন ক্লাস নিয়েছে।
এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী পিয়নের ক্লাস নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে মাঝে মধ্যে ক্লাস নেয়।
এ বিষয়ে পিয়ন আসাদুল ইসলাম বলেন, না, আমি ক্লাস নেই না? তবে ম্যাডামরা যখন থাকেন না তখন মাঝে মধ্যে ক্লাসে যাই। স্কুল চলাকালীন বাইরে ঘোরাফেরার বিষয়ে জানতে চাইলে আসাদুল ইসলাম বলেন- আমি স্কুলেই থাকি। তবে পাল্টা প্রশ্নে যখন বলা হলো- আমি (সাংবাদিক) বেলা ১২ টার সময় স্কুলে ঢোকার সময় দেখলাম আপনি মাঠে মোটর সাইকেলের উপরে বসে আছেন অথচ আমরা প্রায় দেড় ঘন্টা যাবৎ স্কুলে অবস্থান করাকালীন একবারও স্কুলের অফিসে আসলেন না! প্রতিউত্তরে তিনি বলেন- লাঞ্চ আওয়ারে ছিলাম। আমি লাঞ্চ করতে গিয়েছিলাম।
বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ও পিয়নের অফিস চলাকালীন বাইরে ঘোরাফেরা এবং পিয়নের লুঙ্গি পরে অফিসে আসার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রামের মধ্যে স্কুল। দুই-একদিন লুঙ্গি পরে এসেছে- সেটাও বিশেষ কারণে।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কমকর্তা শেখ ফারুক হোসেন বলেন, পিয়ন দিয়ে ক্লাস নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। ক্লাস নেওয়ার জন্য আমাদের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক আছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমকর্তা রুহুল আমিন বলেন, পিয়ন কেন ক্লাস নেবে? ক্লাস নেওয়ার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক- শিক্ষিকা আছেন। পিয়নের ক্লাস নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থাণীয় সচেতন মহলের দাবী- প্রাথমিক বিদ্যালয় শিশুদের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি করে। সেই জায়গায় যদি অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতা দেখা দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে। তারা দ্রুত তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।

