
মোজাফ্ফর রহমান: উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় চলতি আমন মৌসুমে সারের তীব্র টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ক্ষেতের ফসল ফেলে রেখে ডিলারদের দুয়ারে ঘুরেও প্রয়োজনমতো ইউরিয়া বা পটাশ পাচ্ছেন না সাধারণ কৃষক ও মৎস্যচাষিরা। কোথাও কোথাও আড়ালে-আবডালে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগও বেশ জোরালো। তবে মাঠের এই হাহাকারের মাঝেই কৃষি বিভাগের অফিশিয়াল বরাদ্দের কাগজপত্রে দেখা গেছে এক অবিশ্বাস্য তথ্য। এক বছরের ব্যবধানে জেলায় সারের চাহিদার কাগজ থেকে রাতারাতি গায়েব হয়ে গেছে প্রায় ৮২ হাজার মেট্রিক টন সার।
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, চলতি রোপা আমন মৌসুমে সাতক্ষীরায় প্রায় ৮৯ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এর পাশাপাশি চিংড়ি ও সাদা মাছের প্রায় ৬৬ হাজার ৭৬০ টি নিবন্ধিত ঘের রয়েছে। এসব মৎস্য ঘেরের আইলে বা পাড়ে ও তলদেশে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করা লাগে। কৃষি ও মৎস্য চাষ বাড়ালেও সরকারি বরাদ্দের তালিকায় সারের চাহিদা এভাবে অস্বাভাবিক হারে কমিয়ে দেখানোয় তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অফিশিয়াল নথি (ছকপত্র) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাতক্ষীরায় প্রধান চার ধরনের সারের (ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি) অনুমোদিত বরাদ্দ ছিল ৭৮,৬৮১ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইউরিয়া সার ৩১১৫৩, টিএসপি ৯৬৯১, ডিএপি ১৪১২৫ এবং এমওপি ১১৮৮৩ মেট্রিকটন। তবে ওই একই সময়ে উপজেলার মাসভিত্তিক প্রকৃত চাহিদার ছকপত্রে ছিল ১,৫৩,৩১৯ মেট্রিক টন সার। এর মধ্যে ইউরিয়া ৬৭৫২৮, টিএসপি ২৪৯৪৬, ডিএপি ২৯৪৬৯ এবং এমওপি ৩৬৭৪০ মেট্রিক টননের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অথচ রহস্যজনকভাবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় সারের সর্বমোট বরাদ্দ ও চাহিদা মাত্র ৭৬,৫৬৭ মেট্রিক টনে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ৩০৭৬১, টিএসপি ৯৬৯১, ডিএপি ১৪৬২৫ এবং এমওপি ১১৮৮৩ মেট্রিক টন। আর উপজেলা মাসভিত্তিক হিসাবপত্রেও নেমে চাহিদা দেখানো হয়েছে মাত্র ৭৫,৯১২ মেট্রিক টনে। এর মধ্যে ইউরিয়া ৩৩৮৪৮, টিএসপি ১০৫১১, ডিএপি ১৯৪৬৩ এবং এমওপি ১২৭৪৫ মেট্রিক টনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে কৃষি বিভাগের নথিতে।
অর্থাৎ আগের বছরের বাস্তব হিসাবের তুলনায় চাহিদার কাগজপত্রে এক ধাক্কায় ৮২ হাজার ১১৬ মেট্রিক টন সার কম দেখানো হয়েছে। এক বছরের সরকারী বরাদ্দের কাগজের চাহিদা এই বিশাল ফারাক এই হিসাব নিয়ে মাঠ পর্যায়ে নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে। কৃষিজমি মহস্য ঘের অপরিবর্তিত থাকা সত্বেও কিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা এতটা কমে গেল তা নিয়ে প্রশ্ন তলেছেন সাধারন কৃষক ও ডিলাররা। এর ফলে কাগজের এই গোলকধাঁধায় পড়ে মাঠে চরম বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা।
পাটকেলঘাটার কৃষক আবুল হোসেন জানান, সারের জন্য এ দোকান ও দোকান ঘুরেও চাহিদামত সার পাচ্ছি না। দুই দিন মাঠ ছেড়ে বাজারে ঘুরে বেড়াতো হয়েছে তারপর মিলেছে দুই ডিলারের দোকান থেকে ১০ কেজি করে ২০ কেজি ইউরিয়া। এভাবে ফসলের ক্ষেত থেকে ডিলারের দোকানে ঘুরতে হচ্ছে কৃষকদের প্রতিনিয়তো।
তালা উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নের কৃষক মফিদুল ইসলাম বলেন, আমন মৌসুমে ইউরিয়া সার সবচেয়ে বেশি দরকার। কিন্তু ডিলারের কাছে গেলে এক বস্তা সারও মেলে না। খোলা বাজারে গিয়ে বস্তাপতি অতিরিক্ত দুই-তিনশো টাকা দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।
একই কথা জানালেন সাতক্ষীরা সদরের গাভা গ্রামের কৃষক অমল কুমার সরকার। তার মতে, কয়েক দিন ধরে সারের দোকানে দোকানে ঘুরছি, তারা বলছে সার নেই। সঠিক সময়ে সার না দিতে পারলে ক্ষেতের ধান রোদে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে। অন্যদিকে দেবহাটার পারুলিয়ার ঘেরচাষি আজিবুর রহমান জানান, ঘেরের আইলে সবজি চাষের জন্য প্রয়োজন মতো ইউরিয়া ও পটাশ সার ডিলারের কাছে মিলছে না।
কৃষকরা জানান, ২৭ টাকা কেজি টিএসপি বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা দরে। ডিএপি বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে।
সংকটের দায় কিছুটা মেনে নিয়ে ধুলিহর বাজারের সাব-ডিলার মো: মোখলেছুর রহমান জানান, সরকার থেকে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে মাঠের চাহিদা মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহ কম বলেই কৃষকদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
একাধিক সার ডিলারের দাবী সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এই তিন মাসে সাতক্ষীরায় প্রায় ২৭ হাজার মেট্রিকটন সারের চাহিদা থাকলেও বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ১১ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ১৬ হাজার মেট্রিকটন কম। অনেক ডিলার পরিস্থিতি সামাল দিতে বাইরের জেলা থেকে বেশি দামে সার নিয়ে কৃষকদের কাছে তা আবার বেশি দামে বিক্রি করছে এমন বাস্ববতার চিত্র এ জেলায়। কৃষকরা ক্ষেতের ফসল বাঁচাতে বাধ্য হচ্ছেন বেশি দামে সার কিনতে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশেন সাতক্ষীরা জেলার সভাপতি শেখ শফিকুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরায় ধানের পাশাপাশি হাজার হাজার মৎস্যঘেরে প্রচুর সার লাগে। কিন্তু সরকারি নীতিমালায় ঘেরের জন্য আলাদা কোনো সার বরাদ্দ থাকে না। ফলে কৃষির বরাদ্দ থেকেই ঘেরে সারের যোগান দিতে হয়। নতুন করে বাস্তবভিত্তিক জরিপ চালিয়ে কৃষি ও মৎস্য দুই খাতের সমম্বিত চাহিদা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
তবে কাগজে-কলমে এই অসংগতি ও মাঠে সারের ঘাটতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো: সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, জেলায় কোনো সার সংকট নেই। বিসিআইসি ও বিএডিসির ১৯৭ জন ডিলার এবং ৬৪২ জন সাব ডিলারদের মাধ্যমে সরকারি নিয়োম সার বিতরণ করা হচ্ছে। কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি বা চড়া দামে সার বিক্রির প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষিবিভাগ থেকে সার সংকটের কথা অস্বিকার করলেও এবং জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সারমজুতের দাবী করা হলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে কৃষক নির্ধারিত দামে সময়মতো চাহিদা অনুযায়ী সার পাচচ্ছে না। চাহিদা নির্ধারনে চরম সমম্বয়হীনতা ও সার সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটিই সাতক্ষীরা জেলা জুড়ে এই সার-ভোগান্তির মুল কারন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

