
সোমবার দুপুরে নগরের সোনাডাঙ্গায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ ওই সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবি- আজমুলের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
মানববন্ধনে আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাইনুল ইসলাম জয় বলেন, ঘটনার ৬০ ঘণ্টা পার হলেও এজাহারভুক্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাঁর ভাষ্য, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পুলিশ তাঁদের আশ্বস্ত করেছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যথায় আবারও আন্দোলনে নামার কথা জানান তিনি।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মোসাম্মৎ সাফা রহমান বলেন, একটি প্লেট ভাতের মূল্য কখনোই একটি জীবনের মূল্যের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জায়গা; সেখানে কোনো ধরনের সহিংসতা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষার্থী ফয়সাল শেখ বলেন, ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থী যাতে এমন সহিংসতার শিকার না হন, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আজমুল হোসেন নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় সলুয়া গ্রামে। গত শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী হলের বিপরীতে ইসলামনগর সড়কের একটি মেসে ঘটনাটি ঘটে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেসের এক শিক্ষার্থীর ভাত খেয়ে ফেলাকে কেন্দ্র করে আজমুলের সঙ্গে কয়েকজনের বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগ তুলে মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও বহিরাগত ব্যক্তি তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে আজমুলকে মেসের ভবনের ছাদে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। এমনকি তাঁর চুল কেটে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে, কারা এবং কীভাবে আজমুলকে মারধর করেছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
গুরুতর আহত অবস্থায় রাত দেড়টার দিকে আজমুলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, আজমুলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে চিকিৎসা নথি, ময়নাতদন্তসহ তদন্তের অন্যান্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মাত্র এক প্লেট ভাত খাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে যদি শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেই অভিযোগের সত্যতা, নির্যাতনের ধরন এবং এতে কারা জড়িত ছিলেন এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
আজমুলের বাবা মো. কুতুব উদ্দিন বাদী হয়ে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে ঘটনার ৬০ ঘণ্টা পার হলেও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার না করায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
পুলিশ অবশ্য বলছে, গ্রেপ্তারের আগে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এতে কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) রেজাউর রহমান টাইমস টুডে’কে বলেন, শিক্ষার্থীরা দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ তাঁদের আশ্বস্ত করেছে।
৬০ ঘণ্টা পরও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যাতে কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার না হন।
আজমুলের বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে উপস্থিত হন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দ্রুত বিচারের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা এবং প্রশাসনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার পর তাঁর দেওয়া আশ্বাসের ভিত্তিতে ব্লকেড কর্মসূচি স্থগিত করেন আন্দোলনকারীরা।
তবে শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট করেছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তাঁরা আবারও কর্মসূচিতে যেতে পারেন।
আজমুলের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে ভাত খাওয়ার অভিযোগটি কীভাবে শারীরিক নির্যাতনে গড়াল? মেসে ঠিক কারা উপস্থিত ছিলেন? আজমুলকে ছাদে নেওয়া হয়েছিল কি না? তাঁর ওপর কী ধরনের নির্যাতন করা হয়েছিল? চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কী? ঘটনাস্থলে বহিরাগত কারা ছিলেন? আর তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি কারা জড়িত?
এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ থাকলে তা, মোবাইল ফোনের তথ্য, চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং মামলার নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে এজাহারে নাম থাকা চার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের মধ্যে কারা জড়িত তাও তদন্তে পরিষ্কার হওয়ার কথা।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্যাম্পাস ও আবাসিক পরিবেশে নিরাপত্তা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং আইনের শাসনের প্রশ্ন। তাই আজমুলের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি এখন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মূল বিষয় হয়ে উঠেছে।

