
সিরাজুল ইসলাম,শ্যামনগর : পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, বনদস্যু ও জলদস্যু আমাদের আশেপাশে বিরাজ করছে। আমরা যদি সামাজিকভাবে সচেতন হই এবং রুখে দাঁড়াই, তাহলে তারা টিকে থাকতে পারবে না। আপনারা যদি তাদের শনাক্ত করেন এবং প্রশাসনকে সহায়তা করেন, তাহলে তাদের রুখে দেওয়া সম্ভব। সুন্দবনে যখন দস্যুরা জেলেদের আটক করছে, তার লেনদেন কিন্তু লোকালয়ে হচ্ছে; হয় খুলনায়, নয়তো সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে। আপনারা এই তথ্য আমাদেরকে সঠিকভাবে দিলে আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, যে কোনো মূল্যে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা হবে, কোনো ছাড় নেই।
তিনি জানান, ইতোমধ্যেই দস্যুমুক্ত করার জন্য খুলনা সার্কিট হাউজে র্যাব, বিজিবি, পুলিশ, সেনা বাহিনী এবং কোস্টগার্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী এসময় বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, এই বিষের কারণে মৎস্য সম্পদসহ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। বন্যপ্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যারা এগুলো বিক্রি করে বা সরবরাহ করে, তাদের গ্রেফতার করার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
তিনি বনবিভাগকে মৌয়ালদের সুবিধার্থে নিয়মিত তদারকি করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বুধবার (১ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টায় সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ৭১ নং বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে সুন্দরবনের মধু আহরণ মৌসুমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। বাংলাভিশনের গুগল নিউজ ফলো করতে ক্লিক করুন
শেখ ফরিদুল ইসলাম আরও বলেন, “মধু আল্লাহর নেয়ামত। এটাকে ভেজাল করা যাবে না। এটিকে ব্র্যান্ড করতে হবে। পরিবারের স্বার্থ ও সামাজিক সম্প্রীতির স্বার্থে কেউ মধুতে ভেজাল দেবেন না। যদি কেউ করে, তাহলে আপনারাই তাকে ধরিয়ে দিবেন।” তিনি উল্লেখ করেন, সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস মধু। সরকার বনজীবীদের নিরাপত্তা এবং জীবনমান উন্নয়নে সবসময় বদ্ধপরিকর।
প্রধান অতিথি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মতো জেলেদেরও কার্ড প্রদান করা হবে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ইমরান আহমেদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন, সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল, সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক মিজ আফরোজা আখতার, সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার মোঃ আরেফিন জুয়েল, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এইচ.এম. রহমত উল্লাহ পলাশ, সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু, যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মোঃ মনিরুজ্জামান এবং স্থানীয় বনজীবিরা।
মধু আহরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনের পর যথাযথ পাস-পারমিটধারী মৌয়ালরা সুন্দরবনের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছেন। উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমে ১১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মধু আহরণ কার্যক্রম ১৬৬ বছর ধরে চলে আসছে।
এরই মধ্যে বনে ফুটেছে খলিসা, গরান, পশুর, হারগোজাসহ রঙ-বেরঙের ফুল। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো বনাঞ্চল। এখন অপেক্ষা রাত পোহানোর। মধু আহরণে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত মৌয়ালরা। তবে উপকূলজুড়ে বনজীবীদের মধ্যে বিরাজ করছে বনদস্যুর আতঙ্ক। ঘ্রাণ ও স্বাদে অতুলনীয় সুন্দরবনের মধু সংগ্রহ করতে জীবনবাজি রাখতে হয় মৌয়ালদের। এতদিন নদীতে কুমির আর ডাঙায় বাঘের ভয় থাকলেও এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে বনদস্যুর আতঙ্ক।
মৌয়ালরা বলছেন, কয়েকটি দস্যু দল বনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে। ফলে এবার মধু আহরণে যেতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেক মৌয়াল। এতে যেমন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে, তেমনি জীবিকা সংকটে পড়তে পারেন হাজারো মৌয়াল।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে টানা দুই মাস মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হবে। এ বছর সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল (১ কুইন্টাল-১০০ কেজি) মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছিল। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে। ২০২৩ সালে আরও কমে হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়। আর ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ কম।
২০২৪ সালে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল মধু আহরণে নিয়োজিত থাকলেও ২০২৫ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৫ হাজারে। স্থানীয়দের মতে, এবার এই সংখ্যা আরও কমতে পারে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের একাধিক মৌয়াল জানান, সুন্দরবনে ডাকাতের তৎপরতা বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অপহরণের ঘটনা বাড়ছে বলে দাবি তাদের। এতে পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকেই বনে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার মৌয়াল শহিদুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকে জঙ্গলে যাই, কোনো দিন বাঘ-কুমিরের ভয় পাইনি। কিন্তু এখন ডাকাতের ভয় সবচেয়ে বেশি। একবার ধরা পড়লে আর রক্ষা নেই। তাই এবার মধু কাটা বাদ দিয়ে এলাকায় দিনমজুরি করবো।
একই গ্রামের মৌয়াল আনছার আলী মোড়ল বলেন, আগে আমরা সাতজন মিলে নৌকায় যেতাম। এবার ডাকাতের ভয়ে কেউই যেতে চাইছে না।
মুন্সিগঞ্জের মৌখালী গ্রামের মৌয়াল বশির আলী মোড়ল বলেন, ‘বাপ-দাদার পেশা হলেও নিরাপত্তা না থাকলে এ পেশা ছেড়ে দিতে হবে।’
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনাখালী গ্রামের মৌয়াল আবুল সানা বলেন, ‘ঋণ করে মধু কাটতে যাই। কিন্তু ডাকাতের হাতে পড়লে সব হারিয়ে নিঃস্ব হতে হয়।’
তবে বন বিভাগ বলছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

