
# কালিগঞ্জে কৃষকের সেচ পাম্পের আবেদন আটকে দেওয়ার নেপথ্যে কার সিন্ডিকেট?
মো. ইশারাত আলী: কালিগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক মো. রুহুল আমিন গাজীর সেচ পাম্পের আবেদন আটকে রাখা এবং তাঁর দুটি বৈধ লেয়ার বাতিলের ঘটনায় স্থানীয় কৃষি বিভাগের দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে এটিকে স্রেফ প্রশাসনিক জটিলতা মনে হতে পারে, কিন্তু এর গভীরে রয়েছে এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট-যার শেকড় প্রোথিত রয়েছে সদ্য বিদায়ী কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসীম উদ্দীন ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের যৌথ কারসাজিতে ভরা। নথির মারপ্যাঁচ, অনিয়মের বরপুত্র আর এক প্রবীণ কৃষকের সর্বস্বান্ত হওয়ার বিষয়টি এখন কালিগঞ্জে বেশ আলোচিত।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথিপত্র এবং কালপঞ্জি দেখলে কালিগঞ্জ কৃষি অফিসের ভেতরের অনিয়মের আসল চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে যায়। কোনো ধরনের লেয়ার বা পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই গত ৫ এপ্রিল আবেদন করেন একই এলাকার মোস্তাফিজুর রহমান। অন্যদিকে, সমস্ত নিয়ম মেনে, দুটি লেয়ারসহ যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গত ১৬ জুন আবেদন জমা দেন প্রবীণ কৃষক রুহুল আমিন গাজী। এর আগে গত ২৫ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সভাকক্ষে মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় কোনো নিয়ম বা লেয়ার ছাড়াই মোস্তাফিজুর রহমানের আবেদন পাস করিয়ে নেওয়া হয়! অথচ উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের পূর্ববর্তী ভুল পরামর্শ ও প্রলোভনে পাইপ বসানো রুহুল আমিন গাজীর দুটি লেয়ার পরিকল্পিতভাবে বাতিল করা হয়। এখানেই কি কৃষি অফিসের লুটপাট অফিসারের বিদায় ঘন্টা!
এই দ্বিমুখী নীতি ও পক্ষপাতিত্বের কারণে প্রবীণ কৃষক রুহুল আমিনের গচ্চা গেছে প্রায় ১ লক্ষ টাকা। আর এই নগ্ন বৈষম্যের প্রতিবাদে ভুক্তভোগী কৃষকদের একটাই জোরালো দাবি-এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে অবিলম্বে রাঙামাটিতে বদলি করা হোক।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুহুল আমিন গাজী বলেন, “কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের পরামর্শে পাইপ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে আমার প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ ও অপচয় হয়েছে। সব নিয়ম মেনে কাজ করার পরও আমার ফাইল উপজেলা মিটিংয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে তোলা হলো না। উল্টো দুটি লেয়ার বাতিল করে আমাকে নিঃস্ব করার পাঁয়তারা চলছে। এই ১ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?”
এ বিষয়ে বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলিম আল রাজি তাপস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রুহুল আমিন গাজীর বৈধ লেয়ার বাতিল করে অন্যজনকে অবৈধভাবে সেই সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার পেছনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই এই দুর্নীতির আসল রূপ বেরিয়ে আসবে।”
ন্যায়বিচার পেতে গত ৭ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত প্রতিকার চান প্রবীণ এই কৃষক। ইউএনও মহোদয়ের হস্তক্ষেপে তাঁকে কৃষি অফিসে পাঠানো হলেও সেখানে তাঁকে দিনের পর দিন ঘোরানো হয় এবং ভিন্ন জমির দাগ-খতিয়ান দিতে বলা হয়—যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও হয়রানিমূলক। দিনের পর দিন ঘুরেও যখন কোনো সুরাহা মেলেনি, তখন বাধ্য হয়ে তিনি প্রশাসনের শীর্ষ মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান দায়সারাভাবে দাবি করেন, “তিনি দেরিতে আবেদন করেছেন, তাই উপজেলা মিটিংয়ে পাস হয়নি। আবার আবেদন করলে দেখা হবে।” নিজের অপকর্ম ঢাকতে তিনি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করলেও নথিপত্র জনসমক্ষে আনার প্রশ্নে বরাবরই চুপ থেকেছেন।
সদ্য বদলি হওয়া কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসীম উদ্দীনের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক সিন্ডিকেট ‘প্রেতাত্মা’ এখনও বহাল তবিয়তে সক্রিয়, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সত্য উদ্ঘাটনে অবিলম্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে নিচের প্রশ্নগুলোর জবাব কৃষকরা
কোন জাদুবলে ৫ এপ্রিলের লেয়ারবিহীন মোস্তাফিজুরের আবেদন পাস হলো, আর ১৬ জুনের নিয়মতান্ত্রিক রুহুল আমিনের ফাইল চাপা দেওয়া হলো? উপজেলা সভার কোন গোপন রেজুলেশনে এই আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে, তার কার্যবিবরণীর কপি কোথায়? একই ব্লকে বা ইউনিয়নে গত ছয় মাসে যতগুলো সেচ পাম্পের লেয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তাদের দূরত্বের মাপ ও কাগজপত্রের সাথে রুহুল আমিনের ফাইলের তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রকাশ করা হোক।
প্রবীণ কৃষক রুহুল আমিন গাজীর পরিষ্কার কথা-নথি কথা বলুক, প্রশাসনিক তদন্ত হোক হয়রানির অবসান হোক। কালিগঞ্জ কৃষি অফিস কোনো দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট বা বিশেষ মহলের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হতে পারে না। অবিলম্বে এই দুর্নীতির বিচার না হলে স্থানীয় কৃষকরা আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।

