
মো.কামাল উদ্দিনঃ খুলশী থানাধীন টাইগারপাস এলাকায় সংঘটিত দুইটি পৃথক ঘটনায় নির্যাতিত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে থানায় লিখিত এজাহার দাখিল করা হয়েছে। এজাহারে সংঘবদ্ধ হামলা, গুরুতর জখম, শ্লীলতাহানি, ভাঙচুর, লুটপাট, চুরি এবং প্রাণনাশের হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা আহত হয়েছেন, চিকিৎসা নিয়েছেন, থানায় অভিযোগ দিয়েছেন এবং সর্বশেষ বিচার না পেয়ে সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ অনুযায়ী এজাহার দাখিলের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখনো মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। নির্যাতিতরা যখন বিচার প্রার্থনা করে থানার দ্বারস্থ হন, তখন তাদের প্রত্যাশা থাকে আইন তাদের আশ্রয় দেবে। কিন্তু অভিযোগ যদি হয় যে এজাহার দেওয়ার পরও তারা বিচার প্রক্রিয়ার শুরুটুকুও দেখতে পাচ্ছেন না, তাহলে সেই হতাশা শুধু একটি পরিবারের নয়, তা আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থাকেও নাড়া দেয়। অভিযোগ রয়েছে, সুজন বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অপরাধের বর্ণনা এজাহারে উল্লেখ করা হলেও অভিযুক্তরা এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, কিন্তু তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অনুপস্থিতি জনমনে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। আমি কোনো ব্যক্তিকে আদালতের রায়ের আগে অপরাধী বলতে চাই না। কিন্তু আমি জানতে চাই, দুইটি গুরুতর এজাহার, আহত ভুক্তভোগী, চিকিৎসার কাগজপত্র এবং প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের পরও কেন আইনগত প্রক্রিয়া দৃশ্যমানভাবে এগোচ্ছে না? কেন নির্যাতিত মানুষেরা আজও বিচারপ্রার্থীর কাতারে দাঁড়িয়ে? কেন তাদের আর্তনাদ প্রশাসনের টেবিলে পৌঁছেও কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠছে? এই কারণেই মাননীয় পুলিশ কমিশনারের কাছে অনুরোধ, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। কারণ বিচার বিলম্বিত হলে শুধু ভুক্তভোগী নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা গড়ে ওঠে আদালতের রায়ে নয়, বরং সেই মুহূর্তে যখন একজন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে তার আর্তনাদ কেউ শুনবে। একজন নির্যাতিত নারী, একজন আহত নাগরিক কিংবা একটি আতঙ্কিত পরিবার যখন থানার দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়, তখন তারা কেবল একটি অভিযোগ দায়ের করতে যায় না; তারা রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচারের আবেদন জানায়। কিন্তু সেই আবেদন যদি দিনের পর দিন অপেক্ষার প্রহরে পরিণত হয়, যদি এজাহার জমা দেওয়ার পরও মামলার অগ্রগতি দৃশ্যমান না হয়, যদি ভুক্তভোগীরা সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য হন, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—আমরা কি সত্যিই এমন একটি রাষ্ট্রে বাস করছি যেখানে আইনের দুয়ার সবার জন্য সমানভাবে খোলা? চট্টগ্রামের খুলশী থানাকে ঘিরে সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা আজ এমনই এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। টাইগারপাস রেলওয়ে কলোনির দুইটি পৃথক পরিবারের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া দুইটি এজাহারে ভয়াবহ সব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সংঘবদ্ধভাবে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, গভীর রাতে বাড়ির দরজা ভেঙে প্রবেশ করা হয়েছে, নারী সদস্যদের ওপর হামলা হয়েছে, শ্লীলতাহানির অভিযোগ রয়েছে, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগ রয়েছে, গুরুতর জখমের অভিযোগ রয়েছে এবং প্রাণনাশের হুমকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
একটি এজাহারে বলা হয়েছে, পূর্বের একটি মামলার জেরে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয়েছে। অন্য এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, হামলার পর পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সুযোগে পুনরায় বাসায় প্রবেশ করে মূল্যবান মালামাল চুরি করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালত ও তদন্ত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে। কিন্তু যে প্রশ্নটি আজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তা হলো—এত গুরুতর অভিযোগের পরও কেন মামলা রুজুর বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই? আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার না পেয়ে গত ২১ জুন সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেছেন যে, থানায় লিখিত এজাহার জমা দেওয়ার পরও তারা প্রত্যাশিত আইনগত প্রতিকার পাননি। এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। একজন সাধারণ মানুষ সংবাদ সম্মেলন করেন না আনন্দের জন্য। তিনি সংবাদ সম্মেলন করেন তখনই, যখন তার মনে হয় তার কণ্ঠস্বর কোথাও পৌঁছাচ্ছে না। তিনি সংবাদ সম্মেলন করেন তখনই, যখন তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তার আর্তনাদ প্রশাসনিক দেয়ালে আটকে গেছে। আজ প্রশ্ন হচ্ছে—যদি একজন আহত নারী, একজন নির্যাতিত পরিবার, একজন আতঙ্কিত নাগরিক থানায় গিয়ে প্রত্যাশিত সাড়া না পান, তাহলে তারা কোথায় যাবেন? কার কাছে যাবেন? কোন দরজায় কড়া নাড়বেন? রাষ্ট্রের কোন প্রতিষ্ঠানের ওপর তারা ভরসা করবেন? খুলশী থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে জনগণের পক্ষ থেকে কয়েকটি সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে এজাহার গুলো কি যথাযথভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল?অভিযোগ গুলো কি আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে?
অভিযোগের বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে কি? আহতদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কি? অভিযুক্তদের বিষয়ে কোনো প্রাথমিক তদন্ত পরিচালিত হয়েছে কি? ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি?
যদি এসব হয়ে থাকে, তাহলে তার অগ্রগতি কী?আর যদি না হয়ে থাকে, তাহলে কেন? এই প্রশ্নগুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। এই প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার প্রশ্ন। কারণ পুলিশের দায়িত্ব কেবল অপরাধী গ্রেপ্তার করা নয়; পুলিশের দায়িত্ব মানুষের আস্থা রক্ষা করা। একটি থানার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন নয়, তার অস্ত্র নয়, তার গাড়ি নয়; তার সবচেয়ে বড় সম্পদ জনগণের বিশ্বাস। আর যখন সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।

