
অনলাইন ডেস্ক : খুলনায় অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে হামলা, হত্যাযজ্ঞসহ হানাদার বাহিনীর রোষানলে পড়া এই স্থানগুলো শনাক্ত করা হলেও তার বেশিরভাগই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। যেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেগুলোও রয়েছে অরক্ষিত অবস্থায়। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানগুলোর এমন বেহাল দশায় উদ্বেগ ও হতাশা জানিয়েছে সচেতন মহল।
সারা বছর অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত স্থান খুলনার চুকনগর বধ্যভূমি। ঝোপঝাড়ে ছেয়ে থাকে। নেই স্মৃতিফলক কিংবা সাইনবোর্ড। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও এখানে তৈরি হয়নি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবস সামনে এলে বধ্যভূমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। বছরের অন্য সময় খোঁজ নেয় না কেউ।
খুলনা শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার পশ্চিমে ভারত সীমান্তবর্তী ভদ্রা নদীর তীরবর্তী একটি অঞ্চল চুকনগর। জায়গাটা পড়েছে ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নে। চুকনগরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সেদিন ১০ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করা হয়। মানুষের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল পাশের ঘ্যাংরাইল নদের পানি। একটি এলাকায় একদিনে এত মানুষ আর হত্যার শিকার হয়নি। সেদিনের শহীদদের স্মরণে ২০০৬ সালে সাত লাখ টাকা ব্যয়ে ‘চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করেছিল গণপূর্ত বিভাগ। গত ২০ বছরেও পূর্ণতা পায়নি এই স্মৃতিস্তম্ভ। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আজ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে সীমানাপ্রাচীরের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়েছে। এগুলো সংস্কারের জন্য নেওয়া হয়নি কোনও উদ্যোগ।
পাশাপাশি খুলনা মহানগরের প্রবেশপথে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান গল্লামারী বধ্যভূমি। ২০০৯ সালে এখানে নির্মিত হয়েছিল ‘গল্লামারী স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ’। মূলস্তম্ভ তৈরি হলেও অর্থ সঙ্কটে বাকি কাজ ১৭ বছরেও হয়নি। কাজের জন্য অর্থ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েও সাড়া পায়নি জেলা পরিষদ। ফলে পূর্ণতা পায়নি স্মৃতিসৌধটি। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে এটি।
খুলনার গণকবরগুলো শনাক্তকরণ কার্যক্রমে যুক্ত থাকা নাগরিক নেতা হুমায়ুন কবির ববি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খুলনার গণকবরের স্থানগুলো শনাক্ত করার পর ফলক দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু স্থানের ফলক সড়ক উন্নয়নের কারণে সড়কে দেবে গেছে। সরকারিভাবে এসব স্থান সংরক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘গল্লামারী বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু সেখানে একটি ডিজাইন আছে। সেটি আজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে এটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চাই।’
হত্যাযজ্ঞসহ হানাদার বাহিনীর রোষানলে পড়া এই স্থানগুলো শনাক্ত করা হলেও তার বেশিরভাগই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি
ডুমুরিয়া উপজেলায় যুদ্ধকালীন কমান্ডার মো. নুরুল ইসলাম মানিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ও ভয়াবহ গণহত্যার স্থান চুকনগর। এখানে বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ করা হলেও পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয়নি। স্থানটি দেখভালের জন্য একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত রয়েছেন। তিনি সরকারিভাবে ভাতা পেয়ে থাকেন। চুকনগর বধ্যভূমিতে ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চ শ্রদ্ধা জানানো হয়। সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই।’
খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মনিরুল হাসান বাপ্পি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবার ২৬ মার্চ পালনের লক্ষ্যে গল্লামারী ও চুকনগর বধ্যভূমি ধোয়ামোছা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রঙ করার কাজ চলছে। অসমাপ্ত কাজ সপাপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দ্রুত সময়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হবে।’
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান গল্লামারী
শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্বে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের পাশের এই স্থানটি ছিল একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোতে জেলার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়। একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বর খুলনা মুক্ত হওয়ার পর এখান থেকে উদ্ধার হয় কয়েকশ মানুষের মাথার খুলি। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খুলনা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে গল্লামারী বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়। ১৯৯০ সালের ২৬ মার্চ এটির উদ্বোধন করেন শহীদের বাবা আলতাব উদ্দিন আহম্মদ। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হক ও পুলিশ সুপার আওলাদ হোসেনের উদ্যোগে সেখানে অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ এবং ওই বছরের ২৬ মার্চ বিজয় মঞ্চের উদ্বোধন হয়। ২০০৯ সালে এখানে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা জেলা পরিষদ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। দুই কোটি ব্যয়ে নির্মিত মূল স্তম্ভ। এরপর কেটে গেছে ১৭ বছর। দফায় দফায় এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েও সুফল পায়নি জেলা পরিষদ। ফলে স্বাধীনতা সৌধের মূল স্তম্ভ নির্মিত হলেও অর্থ সঙ্কটে বাকি কাজ শেষ হয়নি আজও।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে গল্লামারীতে স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ নির্মাণের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১০ কোটি টাকা। প্রকল্পে রয়েছে মূল স্তম্ভ নির্মাণ, স্তম্ভের চারপাশে ১০ ফুট লাল টাইলস বসানো, পায়ে হাঁটার পথ, পার্কিং ইয়ার্ড, সীমানাপ্রাচীর, গেট, সিকিউরিটি শেড, রেস্টুরেন্ট, দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান, পানির ফোয়ারা ইত্যাদি। ২০০৯ সালের ২৩ জুন দরপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে কাজটি পায় খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজাদ-ইলোরা জেভি। ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয় ২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর। স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১১ সালের নভেম্বরে। ২০১১ সালের মার্চে স্মৃতিসৌধের স্থপতি আমিনুল ইসলাম ইমন নির্মিত স্তম্ভটি পরিদর্শন করেন। তখন তিনি স্মৃতিসৌধটিকে পূর্ণতা দিতে মূল নকশা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন। নকশা অনুযায়ী বাকি কাজ সম্পন্ন করতে আরও আট কোটি টাকা প্রয়োজন। ওই টাকা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও কোনও সাড়া মেলেনি। বর্তমানে সীমানাপ্রাচীর না থাকায় স্মৃতিস্তম্ভটি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।
রক্তাক্ত চুকনগর
মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিক থেকেই ভয়াবহ গণহত্যার পথ বেছে নেয় পাকিস্তানি বাহিনী। ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে শুরু হওয়া বর্বর গণহত্যা স্তব্ধ করে দেয় সবাইকে। হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করা মানুষজন ছুটতে থাকে। ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। ভৌগোলিক কারণে চুকনগর বাজার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তিন দিকে নদী ঘেরা চুকনগর থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারলেই ভারতে যাওয়া যেতো। চুকনগর যেহেতু ছিল যশোর, খুলনা এবং সাতক্ষীরার সংযোগস্থল, তাই সহজেই স্থানটি সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ২০ মে’র আগ পর্যন্ত এই সীমান্ত দিয়ে অনেক মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু রাজাকার আলবদর বিষয়টি জেনে যায় এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে জানিয়ে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানগুলোর এমন বেহাল দশায় উদ্বেগ ও হতাশা জানিয়েছে সচেতন মহল
স্থানীয় লোকজন ও সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার, নির্যাতন ও লুণ্ঠন সহ্য করতে না পেরে বাগেরহাট, রামপাল, মোরেলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মোংলা, খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনা, ফরিদপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। ১৮ ও ১৯ মে দুই দিনে নৌকায় করে ভদ্রা নদী ও ঘ্যাংরাইল নদ দিয়ে চুকনগর বাজার এবং এর আশপাশ এলাকায় জড়ো হন তারা। উদ্দেশ্য, ভারতে পৌঁছানো। চুকনগর এলাকাকে তখন ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতেন লোকজন।
১৯৭১ সালের ২০ মে। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন সকালে ভারতের পথে রওনা দিয়েছিলেন অনেকে। অনেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ সাতক্ষীরা-খুলনা সড়ক ধরে ১৪-১৫ জন পাকিস্তানি সেনা একটি ট্রাক ও একটি খোলা জিপে করে এসে থামে চুকনগর বাজারের পশ্চিম পাশে ঝাউতলায়। সামনে পাতখোলা মাঠ তখনো লোকে লোকারণ্য। আচমকা শুরু হলো গুলিবর্ষণ। রক্তে ভেসে যায় পাতখোলা মাঠ। অন্য ট্রাকটি চুকনগর বাজারের দিকে যায়। সেখানেও চলে ব্রাশফায়ার। রক্তে ভিজে যায় চুকনগর মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা। ভদ্রা নদীতে অবস্থান করছিলেন অনেক মানুষ, তারাও রেহাই পাননি। বিকাল ৩টা পর্যন্ত চলে হত্যাযজ্ঞ। তখন ফজলুর রহমান মোড়লের বয়স ১৪-১৫ বছর। গোলাগুলির মধ্যে পড়েছিলেন। পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণে রক্ষা পান।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, ঘ্যাংরাইল ও ভদ্রা নদীর জোয়ারে ভেসে যায় অসংখ্য লাশ। ঘটনার দিন থেকে পরের ছয়-সাত দিন স্থানীয় কয়েকজন পড়ে থাকা লাশ জোয়ারের সময় পানিতে নামিয়ে রাখতেন। ভাটার সময় নদীতে লাশগুলো একসঙ্গে গেঁথে দূরে গাছে বেঁধে রাখতেন, যাতে জোয়ারে আবার ফিরে না আসে। অনেক লাশ নদীর আরও দূরে ঠেলে দিতেন। কতজন নিহত হয়েছিলেন এই হত্যাকাণ্ডে? ফজলুর রহমান মোড়লের অনুমান, ১০-১২ হাজারের মতো।
এত ভয়াবহ ঘটনা নব্বই দশকের আগ পর্যন্ত অনেকের অজানা ছিল। কারণ মুক্তিযুদ্ধের দলিলে চুকনগর গণহত্যার কথা উল্লেখ নেই। ১৯৯৩ সালে গঠিত হয় ‘চুকনগর গণহত্যা ৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ’। ২০০৪ সালে গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য সরকার এই গ্রামের বিলের ৭৮ শতক জমি অধিগ্রহণ করে। এরপর গণপূর্ত বিভাগ ২০০৬ সালে ওই জমির একাংশে সাত লাখ টাকা ব্যয়ে ‘চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করে। কিন্তু এ বছরেও তা এখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
প্লাটিনাম জুট মিলের হত্যাযজ্ঞ
প্লাটিনাম জুট মিলের হত্যাযজ্ঞ ছিল যেমন রোমহর্ষক, তেমনি নির্মম ও নিষ্ঠুর। মিলের জ্বলন্ত বয়লারের ভেতরে ফেলে কমপক্ষে ৫৬ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। বাঙালি শ্রমিকদের এনে বসানো হতো বয়লারের সামনে ২০ ফুট উঁচু পাকা প্রাচীরের পাশে। এরপর বস্তাবন্দি করে পায়ের দিক থেকে জ্বলন্ত বয়লারের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। ঢোকানো অংশ পুড়ে গেলে দেহের বাকি অংশ ও মাথা একটু একটু করে বয়লারে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। এসব শ্রমিকের মধ্যে হারুন, হেমায়েত, আজিজ প্রমুখের নাম জানা যায়। এগুলো আজও সংরক্ষণ করা হয়নি।
রেলস্টেশনের বধ্যভূমি
খুলনা শহরের কেন্দ্রস্থলে রেলস্টেশন ও রেললাইনের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিল বাঙালি নিধনের একটি ঘাঁটি। এপ্রিল-মে মাসে পাকিস্তানি সৈন্যরা রেলস্টেশন এলাকায় বহু বাঙালিকে হত্যা করেছে। তাদের মধ্যে ছিলেন দেশের অন্য জায়গা থেকে আসা ট্রেনের যাত্রীরা। প্রথমে তাদের সর্বস্ব লুট করা হতো, তারপর হত্যা করে সেসব মৃতদেহের পেট চিরে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো, যাতে করে লাশ গভীরে তলিয়ে যায়।
রেল কলোনি এলাকায় প্রাধান্য ছিল পাকিস্তান সেনাদের সহযোগী একদল অবাঙালির। ওই সময় রেল কলোনি এলাকায় দিনে বা রাতে যখনই কোনও বাঙালি গেছেন, তিনি আর ফেরেননি। তাকে হত্যা করে পুঁতে রাখা হতো। ওসব কলোনিতে বসবাসকারী অনেক বাঙালি রেল কর্মচারীও হয়েছেন হত্যার শিকার। এখান থেকে অন্য গলিত দেহের সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছিল খুলনার দারোগা কাশেমের মরদেহ। এলাকার আশিয়ানী হোটেলের সামনে বিরাট একটা ডোবা আছে। ডোবায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে বহু বাঙালির মৃতদেহ। অনেক সময় বস্তার মধ্যে লাশ ভাসতে দেখা গেছে। একবার একটা বস্তা খুলে দেখা যায় তার ভেতরে শার্ট-প্যান্ট পরা এক তরুণের মৃতদেহ। সেগুলো আজও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।
ফেরিঘাট বধ্যভূমি
খুলনা ফেরিঘাট বধ্যভূমি এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লঞ্চ-স্টিমারের যাত্রীদের ধরে সর্বস্ব লুট করে হত্যা করতো। পরে তাদের লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। খুলনার শিকারপাড়া বধ্যভূমিতে অনেক মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
কাস্টমস ঘাটের বধ্যভূমি
রূপসা নদীর তীরে কাস্টমস ঘাটের বধ্যভূমিটি ছিল কসাইখানা। এখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালিদের পিছমোড়া করে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে নদীতে ফেলে দিতো।
খুলনায় জজকোর্টের পেছনে ফরেস্ট ঘাটে বাঙালিদের গলা কেটে হত্যা করা হতো। মৃতদেহগুলোর পেট চিরে ফেলে দেওয়া হতো নদীতে। সে সময় প্রতিরাতে অন্তত ২০ জনকে এভাবে হত্যা করা হতো। গোয়ালখালী বধ্যভূমিতে স্বাধীনতার পর বহু নরকঙ্কাল ও হাড়গোড় পাওয়া যায়। ভৈরব নদের তীরে ক্রিসেন্ট জুট মিল বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি বাহিনী এই মিলের বাঙালি শ্রমিকদের হত্যা করে নদীতে ছুড়ে ফেলে দিতো। স্বাধীনতার পর শহরের উপকণ্ঠে কান্তপুর বধ্যভূমিতে অনেক কঙ্কাল পাওয়া যায়। কঙ্কালগুলোতে জড়ানো রয়েছে শাড়ি কিংবা লুঙ্গি। চরেরহাটে পাঁচ শতাধিক মানুষকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এখানে এপ্রিল মাসে দৌলতপুরের দিক থেকে কয়েকটি লঞ্চ খুলনার দিকে আসে। লঞ্চগুলো ছিল যাত্রীভর্তি। এই চরেরহাটে পাকিস্তানি সেনারা লঞ্চগুলো থামিয়ে যাত্রীদের নদীর তীরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। এরপর যাত্রীদের মালামাল লুট করে তাদের গুলি করে হত্যা করে।
খালিশপুরে অসংখ্য গণকবর ও বধ্যভূমি অরক্ষিত
খুলনার খালিশপুরে অসংখ্য গণকবর ও বধ্যভূমি রয়েছে। নিউজপ্রিন্ট মিলের বধ্যভূমিতে মিলের শ্রমিকদের লাশ রয়েছে। সে সময় খুলনা বেতারের মাধ্যমে ঘন ঘন শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ প্রচার করা হয়, অন্যথায় তারা চাকরি হারাবেন এমন কথাও বলা হয়। বাঙালি শ্রমিকদের অনেকেই তাদের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য কাজে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা জানতেন না কী মরণফাঁদ অপেক্ষা করছে। শ্রমিকেরা সেদিন কাজে যোগ দিলে পাকিস্তানি সেনারা তাদের সবাইকে গ্রেফতার করে একে একে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। শলুয়া বাজারের বধ্যভূমিতে ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ হঠাৎ করে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী হামলা চালালে এখানে অসংখ্য মানুষ গুলি খেয়ে মারা যান। কিন্তু আজও সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়নি।
মহানগরীর মহেশ্বরপাশা পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে ছিল নারায়ণ মজুমদারের বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নারায়ণ মুজমদার বাড়ি ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেলে বাড়িটি লুটপাট হয়। এরপর হানাদার বাহিনী বাড়িতে ক্যাস্প করে। বাড়ির ক্যাম্পে ছিল নির্যাতনের ঘর। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে এখানকার কালী মন্দিরের পুরোহিত সতিশ চক্রবতীসহ ছয় জনকে গুলিতে হত্যা হয়। এখানে হত্যা করা হয় দৌলতপুর মহাসিন স্কুলের শিক্ষক শেখ মুহাম্মাদ হানিফের তিন সন্তানকে। কাঠের তৈরি তৎকালীন এই বাড়ির স্থানে বর্তমানে তৈরি হয়েছে পাকা ভবন। বর্তমানে সেটি কৃষি অধিদফতরের অধীনে আছে। তবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

