
প্রমথ সানা,পাইকগাছা:খুলনার উপকূলীয় জনপদ পাইকগাছাসহ আশেপাশের অঞ্চলে গত কয়েকদিন ধরে বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপদাহ। আগুনের গোলার মতো ঝরছে রোদ, আর সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। প্রকৃতি যেন রীতিমতো রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। একদিকে অসহ্য গরম, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এটি আরও প্রকট। শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বেড়েছে, তেমনি বিপাকে পড়েছে প্রাণিকুলও। জনজীবনে স্থবিরতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। খুলনা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, এ অঞ্চলে তাপমাত্রার পারদ ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে উঠানামা করছে। তীব্র গরমে খেটে খাওয়া মানুষ, বিশেষ করে ভ্যান চালক, কৃষক ও দিনমজুররা চরম সংকটে পড়েছেন। দুপুরের আগেই রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়ছে। পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিনে ডায়রিয়া, জ্বর ও পানিশূন্যতা নিয়ে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বিশেষ করে ছোট শিশুরা নিউমোনিয়া ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসকরা এই সময়ে প্রচুর পরিমাণে পানি ও স্যালাইন খাওয়ার পরামর্শ দিলেও শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে তপ্ত রোদে কাজ করা ছাড়া উপায় নেই। বিষাদময় জনপদে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে অসহনীয় লোডশেডিং। পাইকগাছার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম হওয়ায় দিনে-রাতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আশাকরি এসমস্যা বেশি দিন থাকবে না।
এদিকে,রাতের বেলা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে বাজারে আইসক্রিম ও ঠান্ডা পানীয়ের দোকান ছাড়া অন্য সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ক্রেতার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তীব্র গরমে শুধু মানুষই নয়, প্রাণিকুলও আজ অসহায়। পুকুর ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় তৃষ্ণার্ত পশুপাখিরা চাতক পাখির মতো পানির অপেক্ষায় থাকছে। গরু-ছাগল নিয়ে খামারিরা চরম দুশ্চিন্তায় আছেন; গরমে গবাদি পশুর খাদ্য গ্রহণ কমে গেছে এবং উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। উপকূলীয় এই অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরগুলোতে পানি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় মাছ মরে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন মৎস্যজীবীরা।
মাঠে এখন বোরো ধান পেকে সোনালী বর্ণ ধারণ করেছে। কিন্তু তীব্র তাপদাহের কারণে ধান কাটার শ্রমিকরা মাঠে নামতে অনীহা প্রকাশ করছেন। সকাল ১০টার পর থেকে রোদের তীব্রতা এতটাই বাড়ছে যে, খোলা মাঠে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। পাইকগাছার গদাইপুর, হরিঢালী, গড়ইখালী ও রাড়ুলী এলাকার কৃষকরা জানান, অতিরিক্ত গরমে অনেক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, ফলে দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও সময়মতো ধান কাটার লোক পাওয়া যাচ্ছে না। এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। স্কুল চলাকালীন দুপুরের তীব্র রোদে অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অভিভাবকরা জানান, গরমের কারণে ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া তো দূরের কথা, বাড়িতে ফিরেও লোডশেডিংয়ের কারণে শিশুরা শান্তিতে ঘুমাতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে এবং শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ক্লাসগুলো ভোরে শুরু করে দ্রুত শেষ করা তথা ‘মর্নিং স্কুল’ চালুর দাবি তুলেছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল।
পাইকগাছার প্রবীণরা বলছেন, গত কয়েক দশকের মধ্যে এমন রুক্ষ আবহাওয়া তারা খুব কমই দেখেছেন। বৃষ্টির জন্য হাহাকার চারিদিকে। সাধারণ মানুষের দাবি, এই দুর্যোগকালীন সময়ে অন্তত লোডশেডিং কমিয়ে জনজীবনকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া হোক। না হলে হিটস্ট্রোকসহ নানা প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সতর্কবার্তায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. আহসানারা বিনতে আহমেদ এর মতে, এই তীব্র গরমে প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়া, ছাতা ব্যবহার করা এবং হালকা রঙের সুতি কাপড় পরা জরুরি। শরীর খারাপ লাগলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

