
#শ্যামনগরে দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের চাপ
মোজাফ্ফর রহমানঃ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সাতক্ষীরায় পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। জেলা প্রশাসন ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আয়োজনে সকালে জেলা কালেক্টরেট চত্বর থেকে একটি র্যালি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।সভায় বক্তারা বলেন, সাক্ষরতা শুধু অক্ষরজ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে জীবনমুখী, কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান অর্জন জরুরি। বিশেষ করে ঝরে পড়া শিশু, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনতে সাক্ষরতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।সভায় সভাপতিত্ব করেন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মোজাফফর উদ্দিন। প্রধান অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবিরসহ শিক্ষা বিভাগ ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা।তবে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে যখন ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জেলার সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশের বেশি হলেও শ্যামনগর ও আশাশুনির বিভিন্ন এলাকায় এখনো বহু শিশু শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ছে। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, জীবিকার অনিশ্চয়তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত সংকট তাদের শিক্ষাজীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার সাতক্ষীরা জেলায় ৭৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৭৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং নারীর ৭১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
।।দারিদ্র্যের চাপে স্কুল ছাড়ছে শিশু।।
সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যামনগরের বহু পরিবারের জীবিকা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি আহরণ, কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা ও কাজের অনিশ্চয়তায় অনেক পরিবার নিয়মিত আয় থেকে বঞ্চিত হয়। সংসারের ব্যয় সামলাতে কোথাও কোথাও শিশুদেরও কাজে যুক্ত করা হচ্ছে।
শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের মাদ্রাসাশিক্ষক আব্দুর রহিম বলেন, ‘দারিদ্র্যের চাপে শিশুরা একপ্রকার বাধ্য হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে ছুটছে। অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।’
স্থানীয় এনজিও কর্মী পিযুষ বাওয়াল বলেন, শ্যামনগরে দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া এবং বাল্যবিয়ের বিষয়টি প্রকট আকার ধারণ করেছে।
।। ঝরে পড়ার হালনাগাদ তথ্য নেই।।
শ্যামনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে উপজেলার ৪৬টি স্কুল, ৩৬টি মাদ্রাসা ও তিনটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে অষ্টম শ্রেণিতে মোট ৫ হাজার ৬৫৭ শিক্ষার্থী ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে তাদের কতজন শিক্ষাজীবন ধরে রাখতে পেরেছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ ও ইউনিয়নভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ তথ্য জানতে শ্যামনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরমোহাম্মদ তেজারতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অসুস্থতার কারণে তিনি তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আশেক-ই এলাহী বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করলেই হবে না, শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ।’
।। ২২ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে প্রশ্ন।।
ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে ২০২১ সালে সাতক্ষীরায় ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন এডুকেশন প্রোগ্রাম’-এর আওতায় ৪২০টি শিক্ষাকেন্দ্র চালু করা হয়। সাতক্ষীরা উন্নয়ন সংস্থা (সাস) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। সাতক্ষীরা সদর, তালা, কলারোয়া, আশাশুনি, দেবহাটা ও কালিগঞ্জ—এই ছয় উপজেলায় কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হয়।
প্রতিটি কেন্দ্রে ৩০ জন করে মোট ১২ হাজার ৬০০ শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগ দিয়ে তাদের আবার মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনাই ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য। কর্মজীবী শিশুদের কথা বিবেচনায় নিয়ে অনেক কেন্দ্রের সময়সূচিও নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ ওঠে। শিক্ষকদের কয়েক মাস বেতন না দেওয়া, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ না করা, কেন্দ্র ভাড়া কম দেওয়া এবং ভুয়া শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরির অভিযোগও ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, ২২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার প্রকল্পটি কাগজে-কলমে শতভাগ সফল দেখানো হলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংস্থাটির পরিচালক ইমান আলী। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ছয়টি উপজেলাকে নিরক্ষরমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। মাঝপথে জেলা প্রশাসন প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়ায় এটি সফলতার মুখ দেখেনি।
তৎকালীন জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৩০০। অথচ প্রকল্পের আওতাধীন কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী দেখানো হয়—এ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
প্রকল্পের শুরু থেকেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক হুমায়ূন কবির ২০২৪ সালে প্রকল্পের মেয়াদ না বাড়িয়ে তা বন্ধের সুপারিশ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ছয় উপজেলায় পরিচালিত ৪২০টি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রের তালিকায় শ্যামনগর উপজেলা ছিল না। অথচ বর্তমানে এই উপজেলাতেই দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের কারণে শিশুদের ঝরে পড়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আশাশুনি উপজেলার বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী জিএম মুজিবর রহমান বলেন, ওই প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর কতজন শিশু প্রকৃতপক্ষে সাক্ষরতার আওতায় এসেছিল, তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘ছয় উপজেলায় পরিচালিত ৪২০টি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রের তালিকায় শ্যামনগর না থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।’
।। শ্যামনগরের জন্য নতুন প্রকল্প।।
সাতক্ষীরা জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক মোজাফফর উদ্দিন বলেন, ‘তৎকালীন সময়ে আমি কর্মস্থলে ছিলাম না। ফলে ওই প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে আমার জানা নেই।’
তিনি বলেন, শ্যামনগর উপকূলীয় উপজেলা হওয়া সত্ত্বেও আগের প্রকল্পে বাদ পড়েছিল। এবার নতুন করে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দ্রুত এর কার্যক্রম শুরু হবে। এর মাধ্যমে উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরকে নিরক্ষরমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
।। স্কুল ফিডিংয়ে ২৬ হাজার শিশু।।
উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে শ্যামনগরে ২০২৫ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্যামনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুল হক।
তিনি বলেন, উপজেলার ১৯১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২৬ হাজার শিশু এই কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে। পুষ্টিকর বিস্কুট, ইউএইচটি মিল্ক, পাকাকলা, বন্ড রুটি ও সিদ্ধ ডিম—এই পাঁচ ধরনের খাবারের মধ্যে প্রতিদিন দুই ধরনের খাবার দেওয়া হচ্ছে। পুষ্টি সহায়তার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো এবং ঝরে পড়া কমানোও এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
তবে কর্মসূচিটির প্রকৃত প্রভাব যাচাই করতে এর আগে ও পরে বিদ্যালয়ভিত্তিক উপস্থিতি, অনুপস্থিতি ও ঝরে পড়ার তথ্য তুলনা করার দাবি জানিয়েছেন শ্যামনগরের গনমাধ্যমকর্মী প্রভাষক সামিউল মনির।
প্রশ্ন থাকছে বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের সংখ্যা নিয়ে
শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আজকের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তারা যখন ঝরে পড়া শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, তখন সাতক্ষীরার বাস্তবতা থেকে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—জেলায় সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশের বেশি হলেও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর সঠিক সংখ্যা কত?’
তিনি বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুর তালিকা, তাদের বয়স, পরিবারের আর্থিক অবস্থা, ঝরে পড়ার কারণ এবং পুনরায় বিদ্যালয়ে ফেরানোর অগ্রগতি নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের মতে, শ্যামনগর ও আশাশুনির মতো উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও জলবায়ুজনিত সংকট বিবেচনায় নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন।
‘সাক্ষরতার সাফল্য শুধু কতজন মানুষ পড়তে ও লিখতে পারে, সেই হিসাব নয়। কত শিশু স্কুলে ঢুকছে, কতজন টিকে থাকছে এবং ঝরে পড়ার পর কতজনকে আবার শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে—সেই হিসাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ,’ বলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের আয়োজন তাই সাতক্ষীরার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই তুলে ধরেছে—জেলায় সাক্ষরতার হার বাড়ছে, কিন্তু উপকূলের ঝরে পড়া শিশুদের কতজন সত্যিই শিক্ষার আলোয় ফিরছে?

