
হাবিবুর রহমান/ফেরদৌস আহমেদ,শ্যামনগর থেকে ফিরে:
পাঁচনদীর মোহনার এ পারে গোলাখালি-কালিঞ্চি ওপারে শমশের নগর। এই রুট ব্যবহার হচ্ছে মাদক-অস্ত্র চোরাচালানে। সরকারের অন্তত পাঁচটি দপ্তরের অসাধু কর্তা ব্যক্তিরা চোরাচালানে সহায়তা করে লুটে নিচ্ছে কাড়িকাড়ি টাকা। সরকার বদলের সাথে সাথে চোরাচালানের শেল্টারদাতা গডফাদার ও বদল হয়েছে। সাতনদীর গোপন অনুসন্ধানে এ সব চালচিত্র উঠে আসছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের সীমান্ত উপজেলা শ্যামনগর। সীমান্ত নদী রায়মঙ্গলের ওপারে শমশের নগর এপারে কালিঞ্চি-গোলাখালি-মাঝখানে পাঁচনদীর মোহনা। এই পাঁচনদীর মোহনার বাংলাদেশে পারে বয়ারসিং-এ একটা এবং কৈখালিতে একটা করে দু’টি বিজিবি ক্যাম্প। কৈখালীতে কোস্টগার্ডের এবং ফরেস্ট ষ্টেশন অফিস। কালিঞ্চি গ্রামে নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। চক্রারে সরকারি পাঁচটি অফিস থাকলেও খানিকটা চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসাবে বেছে নিয়েছে চোরাচালান সিন্ডিকেট। এই রুট দিয়ে একদিন অন্তর চালান এপার-ওপার হয়।
চোরাইপন্যের মধ্যে অন্যতম কোরেক্স, বিদেশী মদ, অস্ত্র, ইয়াবা ট্যাবলেট, পাতার বিড়ি, গলদা চিংড়ির রেণু, ক্যানসারের কেমো উল্লেখযোগ্য। ৫ আগস্টের পূর্বে শত শত গরু আসছে এখন তা শূন্যের কোঠায়। পাঁচনদীর মোহনা দিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের গডফাদার বিএনপি নেতা ডালিম ও মাসুদ। সিন্ডিকেটের শীর্ষ সদস্যরা হলো হারানীপুর গ্রামের আলমগীর হোসেন বাবু গাজী, বোসখালি গ্রামের আইজুল গাজী, কালিঞ্চি গ্রামের রবিউল ইসলাম গাজী ওরফে চেঙ্গু, উত্তর কৈখালি গ্রামের দেলোয়ার মোহাম্মদ, কৈখালি গ্রামের চর রফিক সাত সদস্যের এই সিন্ডিকেটের মধ্যে পাঁচজন পাঁচটি দপ্তরকে ম্যানেজ করার জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত।
রবিউল ইসলাম গাজী ওরফে চেঙ্গু নৌপুলিশ ও বয়ারসিং এ অবিস্থত পৃথক দু’টি বিজিবি ক্যাম্প, চর রফিক কৈখালী ফরেস্ট ষ্টেশন, আলমগীর হোসেন বাবু গাজী কৈখালীর কোস্টগার্ড ম্যানেজ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। এই সব ব্যক্তিবর্গ ট্রিপ প্রতি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়ে থাকে। পাঁচ দপ্তর ম্যানেজ করার জন্য। প্রতিট্রিপে কৈখালী বিজিবি’র জন্য ২০ হাজার, বয়ারসিং বিজিবি’র জন্য ১৫ হাজার, নৌ-পুলিশের জন্য ১০ হাজার, কোস্টগার্ড’র জন্য ২০ হাজার নিয়ে থাকে।
প্রচার আছে কোস্টগার্ড ও বিজিবি’র এফ এস এর মাধ্যমে তাদেরকে ম্যানেজ করা হয়। অপরদিকে কৈখালী ফরেস্ট ষ্টেশনের ষ্টেশন কর্মকর্তা এবং নৌ-পুলিশের ফাঁড়ির আইসিকে দায়িত্বপ্রাপ্তরা অর্থ দিয়ে থাকে। তবে বিজিবি’র এফএস হাবিলদার ফজলু এবং কোস্টগার্ড এর এফএস রিপন সাতনদীকে এক ও অভিন্ন সুর জানান, অভিযোগ সত্য নয়। চোরাচালানীরা সুযোগ সুবিধা না পেয়ে মিথ্যা প্রচার করে থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোলাখালি এবং কালিঞ্চি গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি সাতনদীকে জানান, একদিন অন্তর অর্থাৎ মাসে অন্তত ১৫টা ট্রিপে চোরাচালানীরা পণ্য এপার-ওপার করে থাকে। শরীর শিউরে উঠার তথ্য দিয়ে একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশপ্রেমিক মাদকবিরোধী যেসব ব্যক্তিরা মাদকের চালান ধরিয়ে দিতে প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে তাদেরকে মিথ্যা অস্ত্র ও মাদক অবস্থায় ফাঁসানো হয়। এই কাজে জড়িত থাকে চোরাচালান সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট অসাধু প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিবর্গ।
গত বৃহস্পতিবার ২৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে রাত দশটায় ভারতের শমশের নগর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা রায়মঙ্গল নদীতে মাদকসহ অন্যান্য পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশ অভিমুখে ছেড়ে আসা ট্রলার আটক করে। এ সময় ওই ট্রলার থেকে জব্দ করা হয় ৬ হাজার পিচ কোরেক্স, ১০০ বোতল বিদেশী মদ, গলদা চিংড়ির রেণু ২০০ ফলি, ৫ বস্তা পাতার বিড়ি। ঐ সময় নদীতে ঝাপ দিয়ে রক্ষা পায়, ট্রলারের মাঝি ও চোরাচালানীরা। তার ট্রলারটিও জব্দ করে বিএসএফ।
একদিন পর শনিবার ২৮ মার্চ, ২০২৬ তারিখে রাত তিনটার সময় একই ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা একই জায়গা থেকে আরও এক ট্রলার চোরাইপণ্য আটক করে। ভারতের পারের চোরাচালানীরা হলো নেপাল, আলী, বিশ্বজিৎ ও প্রদীপ। শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ সাতনদীকে জানান, মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেন তারা। চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিকট থেকে কোন রকম সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। রায়মঙ্গল, মালঞ্চ, কালিঞ্চি, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর মিলিত স্থানকে পাঁচনদীর মোহনা হিসেবে চিহ্নিত। এই পাঁচনদীর মোহনার বাংলাদেশ পারে কালিঞ্চি গোলাখালি এবং ভারতের পারে শামশের নগর।
ভারত-বাংলাদেশর সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল। এই রায়মঙ্গল ক্রস করে দেদারছে আসছে মাদক ও অস্ত্র। এসব পণ্য নদীপথে এবং সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে যায়। সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার সাতনদীকে জানান ট্রিপ প্রতি শ্যামনগর থানা পুলিশ কর্তৃক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার সাতনদীকে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখে ব্যবস্থা নেব। এছাড়া তিনি বলেন, দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ কষ্টসাধ্য তার পরও আমরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি।

