সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর থেকে: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কৃষকরা জমি থেকে আমন ধান সম্পূর্ণ ওঠার আগেই বোরো চাষের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে অনেকেই। আমন ধান কেটে জমি ফাঁকা করে সেখানে বরো চাষের ধানের চারা তৈরি করার জন্য বিচ ধান জমিতে ফেলেছে আবার অনেকেই। আবার অনেকে বোরো ধান চাষের জন্য বীজ ধান পরিচর্যা করছেন। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় বোরো আবাদের প্রতি কৃষকের আগ্রহ দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। বর্তমানে বোরো চাষে কৃষকরা সময় কাটাবে। কৃষকের প্রধান ফসল আমন ঘরে উঠানোর সাথে সাথেই শুকনা মৌসুমের ধান বোরো আবাদের প্রতি কৃষকরা ব্যাপকভাবে ঝুঁকি নিচ্ছে। মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামের জবেদ আলী জানান, তিনি প্রতিবছর ১ একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেন। এবার দেড় একর জমিতে বোরো ধান চাষ করবেন বলে সেই পরিমাণ বিজ সংগ্রহ করেছেন। তিনি আরো জানান, সরকার খাল গুলো যদি ইজারা না দিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবহারের উপযোগী করতেন তাহলে বোরো চাষে কৃষকের সেচের কোন প্রভাব পড়তো না। পানির অভাবে বেশিরভাগ মানুষ বোরো ধান চাষ করতে পারে না। তাই তার মতে খাল গুলো ইজারা না দিয়ে কৃষকের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি করেন তারা। একই গ্রামের তারাপদ মন্ডল জানান, তিনি প্রতিবছর ১ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেন, বিগত বছরে সেখান থেকে ২৪ মন ধান পায়েছেন। এবার তিনি ২ বিঘা জমি চাষ করবেন বলে বীজ সংগ্রহ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সেচের কোনো ঘাটতি না হলে ২ বিঘা জমিতে তার ৫০ মন ধান পাওয়ার আশা। উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউপির ধানখালী গ্রামের বোরো চাষি সুপদ বৈদ্য বলেন, তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হচ্ছেন। গতবছর একই জমিতে বোরো ধানের চাষ করে ভাল ফসল পেয়েছেন। জেলেখালী গ্রামের বোরো চাষি নিরঞ্জন মন্ডল বলেন, বোরো ধান চাষ তিনি বেশ কয়েক বছর যাবত করে আসছেন এবং ফলনও পাচ্ছেন ভাল। কিন্তু বোরো চাষের প্রধান অন্তরায় মিষ্টি পানির অভাব। যে সকল খাল এলাকায় রয়েছে সে গুলিতে লবন পানি ভরা থাকে, লিজ দেওয়া থাকে। আবার পলি পড়ে ভরাট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কৈখালী গ্রামের বোরো চাষি লুৎফর রহমান বলেন, দুই বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে, নিজস্ব পুকুরের পানি ও বৃষ্টির পানি ভরসা করেন। শ্যামনগর ইউপির বোরো চাষি শেখ সিরাজুল ইসলাম বলেন, উপজেলায় আমন ফসলের পর বোরো ধান চাষে কৃষকের আগ্রহ দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। এ ক্ষেত্রে উপজেলার প্রতিটি ইউপির খাল গুলি পুনঃখনন করা, মিষ্টি পানি সংরক্ষণ করা ও বোরো চাষিদের মাঝে লিজ দেওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোদাচ্ছের বিল্লাহ জানান, চলতি বোরো মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ২১৯০ হেক্টর। গত বছর উপজেলায় বোরো চাষ হয়েছিল ২২০০ হেক্টর জমিতে এবং ফলনও ভাল ছিল। লবনাক্ত এলাকা শ্যামনগর উপজেলা হলেও লবন সহিষ্ণু ধান চাষে কৃষকের আগ্রহ বেশী। উপজেলা কৃষি অফিসার নাজমুল হুদা জানান, শ্যামনগর উপজেলায় বোরো ধান চাষে কৃষকের আগ্রহ বেড়ে চলেছে যেভাবে সেক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। এবার আশা করা যায় ৩৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হতে পারে। উপজেলায় এ পর্যন্ত ১৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়ে গেছে। উপজেলায় কৃষকরা লবন সহিষ্ণু জাত বিনা-১০, ব্রি-৬৭ ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করে থাকেন বলে জানা যায়। উপজেলা কৃষি অফিসার আরো বলেন, উপজেলায় ১২০টির অধিক খাল রয়েছে যে গুলি পুনঃখনন করে মিষ্টি পানি সংরক্ষণ করা হলে কৃষকরা শুকনা মৌসুমে বোরো ধান চাষ সহ অন্যান্য ফসল আবাদ করতে পারেন। এখানে মিষ্টি পানির সংকট রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উপজেলায় লবনাক্তার প্রকোপ থাকলেও লবন সহিষ্ণু ধান চাষ করে কৃষকরা সফল হচ্ছেন বলে তিনি জানান। বর্তমানে জমিতে ৩/৪ পিপিটি পরিমান লবন রয়েছে বলে জানা যায়। উপজেলা কৃষি অফিসার নাজমুল হুদা বোরো চাষিদের বেশি বেশি জৈব সার ব্যবহার করার কথা বলেছেন এবং অতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সাথে লবনাক্ততার পরিমাপ মাপার জন্য অফিসে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান তিনি। এদিকে শ্যামনগর উপজেলা চিংড়ী চাষের প্রবন এলাকা হলেও চিংড়ীতে বেশী লাভবান না হওয়ায় কৃষকরা আমন, বোরো ধান চাষ সহ অন্যান্য ফসল আবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন অনেকে। মুন্সিগঞ্জ, কৈখালী, কাশিবাড়ি, ঈশ্বরীপুর, রমজাননগর, ভূরুলিয়া, নুরনগর, শ্যামনগর সহ অন্যান্য ইউনিয়নে বোরো আবাদের ব্যাপক হারে বেড়ে চলেছে। এলাকার সচেতন মহলের মতে জোনিং সিস্টেমে ধান ও চিংড়ী চাষ করা সময়ের দাবী বলে মত প্রকাশ করেছেন অনেকে।