
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর একটি। একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের দরজায় যান, তখন তিনি শুধু চিকিৎসা নিতে যান না—তিনি সঙ্গে নিয়ে যান তাঁর ভয়, উদ্বেগ, প্রত্যাশা এবং পরিবারের উৎকণ্ঠা। অন্যদিকে একজন চিকিৎসক রোগীর সামনে বসেন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে। এই দুই পক্ষের মিলনস্থলই হাসপাতাল। তাই স্বাস্থ্যসেবার মান শুধু চিকিৎসকের দক্ষতা কিংবা হাসপাতালের অবকাঠামো দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চিকিৎসক ও রোগীর পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মনোয়ার হোসাইনের সাম্প্রতিক হাসপাতাল-অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা বক্তব্যটি এই জায়গাতেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় চারদিন সাতক্ষীরার ব্লিস হাসপাতালে রোগী হিসেবে থাকার পর তিনি চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ককে ‘কনসাল্টেন্সি’ থেকে ‘কোঅপারেশন’-এর দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
একজন চিকিৎসক রোগীর সমস্যা শুনবেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন, রোগ নির্ণয় করবেন এবং চিকিৎসা দেবেন—এটি চিকিৎসাব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু রোগীকেও যদি চিকিৎসা-পদ্ধতি, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা দেওয়া যায়, তাহলে চিকিৎসা আরও কার্যকর হতে পারে।
দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের জায়গায় মাঝে মাঝে অবিশ্বাস তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগী বা স্বজন চিকিৎসার ফলাফল সম্পর্কে অবাস্তব প্রত্যাশা করেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী ও স্বজনকে পর্যাপ্তভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হন। ফলে তৈরি হয় ভুল বোঝাবুঝি। আর ভুল বোঝাবুঝি থেকেই কখনো উত্তেজনা, সংঘাত, এমনকি সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি—চিকিৎসক ও রোগী পরস্পরের প্রতিপক্ষ নন। একজন চিকিৎসক রোগীর জীবন ও সুস্থতার জন্য কাজ করেন, আর রোগী চিকিৎসকের চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। এই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত আস্থা, সম্মান, ধৈর্য ও সহযোগিতা।
একই সঙ্গে রোগীরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। চিকিৎসকের কাছে রোগের ইতিহাস সঠিকভাবে বলা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো, চিকিৎসকের পরামর্শ বোঝার চেষ্টা করা এবং চিকিৎসা-প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখা জরুরি। কোনো অভিযোগ বা অসন্তোষ থাকলে সেটিও শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে জানানোর সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।
চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন রোগীর সঙ্গে আরও মানবিক যোগাযোগ। একজন রোগী হয়তো চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষা বোঝেন না। তাই রোগীকে বোঝানোর দায়িত্বও চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি রোগের অবস্থা, চিকিৎসার সম্ভাবনা, ঝুঁকি কিংবা সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে রোগী ও স্বজনকে যত পরিষ্কারভাবে জানানো যাবে, ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তত কমবে।
ডা. মনোয়ার হোসাইনের নিজের জীবনও এই বাস্তবতার একটি মানবিক উদাহরণ। তিনি নিজে রোগী হয়েছেন; ২০১৬ সালে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অপারেশন-জটিলতায় প্রায় ১০ দিন হাসপাতালে ছিলেন। গত বছর ফুড পয়জনিংয়ের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আবার মায়ের কিডনি-সংক্রান্ত চিকিৎসার জন্য প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে ছুটেছেন। অর্থাৎ চিকিৎসক হওয়ার পাশাপাশি রোগী ও রোগীর স্বজনের অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে যে উপলব্ধি এসেছে, সেটি শুধু একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য একটি বৃহত্তর শিক্ষা রয়েছে।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা সংস্কৃতি, যেখানে চিকিৎসক রোগীকে সম্মান করবেন এবং রোগী চিকিৎসককে সম্মান করবেন; হাসপাতাল রোগীকে তথ্য দেবে এবং রোগী হাসপাতালের নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা বুঝবেন; অভিযোগ থাকলে তার সমাধানের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে এবং কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসক, নার্স কিংবা হাসপাতালের কর্মীদের ওপর হামলা যেমন গ্রহণযোগ্য হবে না, তেমনি রোগী ও স্বজনের যৌক্তিক অভিযোগকেও উপেক্ষা করা যাবে না।
স্বাস্থ্যসেবাকে মানবিক করতে হলে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি, নতুন ভবন কিংবা বেশি সংখ্যক হাসপাতাল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানবিক যোগাযোগ, জবাবদিহি, আস্থা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি।
কনসাল্টেন্সি চিকিৎসার শুরু হতে পারে; কিন্তু কোঅপারেশন চিকিৎসাকে সফল করার অন্যতম ভিত্তি।
চিকিৎসক ও রোগী যখন একই লক্ষ্যে—রোগীর সুস্থতার লক্ষ্যে—একসঙ্গে এগিয়ে যাবেন, তখন হাসপাতাল শুধু চিকিৎসা নেওয়ার জায়গা থাকবে না; হয়ে উঠবে আস্থা ও মানবিকতার জায়গা।
দৈনিক সাতনদী মনে করে, চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ককে সংঘাতের নয়, সহযোগিতার সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন সময়ের দাবি।উপসম্পাদকীয়
রোগী যখন চিকিৎসকের সামনে, চিকিৎসকও যখন রোগীর শয্যায়
‘আমি রোগী’—এই অভিজ্ঞতাই চিকিৎসককে অনেক সময় রোগীর পৃথিবীটা নতুন করে দেখায়
একজন চিকিৎসক প্রতিদিন অসংখ্য রোগী দেখেন। কেউ ব্যথায় কাতর, কেউ উৎকণ্ঠিত, কেউ ভীত, আবার কেউ রোগের নামটিই শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। চিকিৎসকের কাছে এগুলো হয়তো তাঁর পেশার প্রতিদিনের দৃশ্য। কিন্তু একজন চিকিৎসক নিজেই যখন রোগীর শয্যায় শুয়ে পড়েন, তখন সেই পরিচিত দৃশ্যগুলো অন্যরকম হয়ে ওঠে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মনোয়ার হোসাইনের সাম্প্রতিক হাসপাতালবাসের অভিজ্ঞতা তাই আমাদের ভাবায়।
প্রায় চারদিন সাতক্ষীরার ব্লিস হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর তিনি শুধু চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাননি; নিজের জীবনের অসুস্থতার বিভিন্ন অধ্যায়ও স্মরণ করেছেন। গত বছরের ফুড পয়জনিং, ২০১৬ সালের অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের জটিলতা এবং তারও আগে মায়ের কিডনি চিকিৎসা নিয়ে প্রায় দুই দশকের ছুটে চলা—সব মিলিয়ে তাঁর রয়েছে চিকিৎসক এবং রোগী, দুই দিক থেকেই স্বাস্থ্যসেবাকে দেখার অভিজ্ঞতা।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মিলন থেকেই এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ—কোঅপারেশন।
চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রোগী কি চিকিৎসার অংশীদার হতে পারেন না?
অবশ্যই পারেন।
রোগী যদি নিজের রোগ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানেন, চিকিৎসকের কাছে রোগের ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরেন, চিকিৎসকের পরামর্শ বোঝেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সহযোগিতা করেন এবং চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার বাস্তবতা উপলব্ধি করেন, তাহলে চিকিৎসাও অনেক বেশি কার্যকর হওয়ার সুযোগ পায়।
আবার চিকিৎসকেরও দায়িত্ব রয়েছে রোগীকে বোঝানোর। একজন রোগী মেডিকেল টার্ম জানবেন—এমনটি প্রত্যাশা করা যায় না। তাই চিকিৎসকের জ্ঞান শুধু প্রেসক্রিপশনে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; প্রয়োজন হলে রোগীকে বুঝিয়ে বলতে হবে তাঁর কী সমস্যা, কী পরীক্ষা প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য পথ কী।
এখানেই ‘কনসাল্টেন্সি’ এবং ‘কোঅপারেশন’-এর পার্থক্য।
কনসাল্টেন্সিতে চিকিৎসক পরামর্শ দেন। কোঅপারেশনে চিকিৎসক ও রোগী একসঙ্গে চিকিৎসার পথটি এগিয়ে নেন।
আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় অনেক বিরোধের পেছনে রোগের জটিলতার পাশাপাশি যোগাযোগের ঘাটতিও ভূমিকা রাখতে পারে। রোগী হয়তো ভাবছেন, চিকিৎসা নিলেই দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন। চিকিৎসক জানেন, প্রতিটি রোগের চিকিৎসার ফলাফল একই নয়। কোনো রোগে সময় লাগে, কোনো চিকিৎসায় ঝুঁকি থাকে, কোনো ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এই পার্থক্যটি যদি শুরুতেই পরিষ্কারভাবে বোঝানো যায়, অনেক ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো সম্ভব।
একইভাবে রোগী ও স্বজনেরও মনে রাখা দরকার—হাসপাতাল একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান, কিন্তু সেখানে কর্মরত প্রত্যেক মানুষও মানুষ। চিকিৎসক, নার্স কিংবা অন্য কোনো কর্মীর সঙ্গে অসৌজন্য বা সহিংস আচরণ কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। অভিযোগ থাকলে তার জন্য নিয়মতান্ত্রিক পথ রয়েছে।
আবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও মনে রাখতে হবে—রোগী ও স্বজনের প্রশ্নকে বিরক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না। অসুস্থ মানুষ এবং তাঁর পরিবার স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইবেন কী হচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক যোগাযোগ স্বাস্থ্যসেবারই অংশ।
ডা. মনোয়ার হোসাইনের বক্তব্যের সবচেয়ে মানবিক দিকটি সম্ভবত এখানেই—তিনি চিকিৎসক হয়েও রোগীর জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন।
তাঁর মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রায় ২০ বছর ধরে হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারে চেম্বারে ঘুরেছেন। তখন তাঁর নিজের ভাষায়, টাকা কিংবা পরিচিতি কিছুই ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা একজন চিকিৎসকের চোখে রোগী ও স্বজনের অসহায়ত্বের অন্য একটি ছবি এঁকে দিয়েছে।
আজ তিনি নিজে চিকিৎসক। আবার কখনো তিনি রোগী। এই দুই পরিচয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি যে কথাটি বলেছেন, সেটি আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ—
চিকিৎসক ও রোগীকে পরস্পরের বিরুদ্ধে নয়, পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে হবে।
চিকিৎসকের দক্ষতা প্রয়োজন, হাসপাতালের অবকাঠামো প্রয়োজন, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি প্রয়োজন বিশ্বাস।
কারণ একজন রোগী যখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকেন, তখন তাঁর হাতে শুধু একটি প্রেসক্রিপশন থাকে না—থাকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা।
আর একজন চিকিৎসক যখন সেই রোগীর পাশে দাঁড়ান, তখন তাঁর হাতেও শুধু স্টেথোস্কোপ থাকে না—থাকে একটি মানুষের জীবনের দায়িত্ব।
এই দুই দায়িত্বের মধ্যে যদি আস্থা তৈরি হয়, তাহলে কনসাল্টেন্সি পেরিয়ে জন্ম নিতে পারে কোঅপারেশন।
আর সেই কোঅপারেশনই হয়তো পারে হাসপাতালের দরজা থেকে সংঘাতকে সরিয়ে সেখানে ফিরিয়ে আনতে মানবিকতা, শ্রদ্ধা ও আস্থার সংস্কৃতি।

