
মেহেদী হাসান: খুলনা মহানগরজুড়ে আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে খুলনা ওয়াসা। ২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার এই প্রকল্প শেষ হলে নগরীর হাজারো পরিবার আধুনিক স্যুয়ারেজ সুবিধার আওতায় আসবে। কিন্তু সেই উন্নয়নকাজ এখন নগরবাসীর জন্য আশীর্বাদের চেয়ে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পয়োনিষ্কাশন পাইপলাইন বসানোর জন্য নগরীর শত শত সড়ক খুঁড়ে রাখা হয়েছে। কোথাও ম্যানহোল বসানোর পর মাসের পর মাস ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও পাইপ বসানোর পরও হয়নি কংক্রিট ঢালাই। ফলে বছরের পর বছর ধরে ধুলাবালি, কাদা, জলাবদ্ধতা আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন নগরবাসী।
ওয়াসা জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৭১টি সড়ক সংস্কার করা হলেও এখনও দুই শতাধিক সড়ক বেহাল অবস্থায় রয়েছে। কোনোটি তিন মাস, কোনোটি ছয় মাস, আবার কোনোটি প্রায় দেড় বছর ধরে সংস্কারের অপেক্ষায়।
খুলনা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মহানগরীর গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানার অধিকাংশ পয়োবর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় উন্মুক্ত পরিবেশে গিয়ে পড়ছে। এ সমস্যা সমাধানে ২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক স্যুয়ারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সংস্থাটি।
প্রকল্পের আওতায় নগরীর ১৫ থেকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ২৭ হাজার বাড়ির পয়োবর্জ্য সংগ্রহ করে শোধনাগারে নেওয়া হবে। এজন্য ২৫৫ কিলোমিটার পাইপলাইন, প্রায় ১২ হাজার ৪৯০টি ম্যানহোল, ২৭ হাজার গৃহসংযোগ, দুটি শোধনাগার এবং আটটি পাম্প স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে।
ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ২১৫ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন এবং প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ম্যানহোল নির্মাণ শেষ হয়েছে। তবে পাইপ বসানোর জন্য যেসব সড়ক কাটা হয়েছে, সেগুলোর বড় একটি অংশ এখনও আগের অবস্থায় ফেরেনি।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেগুলো সংস্কারের জন্য খুলনা সিটি করপোরেশনকে (কেসিসি) ১১২ কোটি টাকা দিয়েছে ওয়াসা।
ওয়াসার দাবি, এই অর্থ দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত সব সড়ক সংস্কারের কথা ছিল। কিন্তু কেসিসি পরে মোট ৬৪১ কোটি টাকা দাবি করলে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়।
এরপর থেকেই শুরু হয় চিঠি চালাচালি, বৈঠক আর দায় ঠেলে দেওয়ার পালা। ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো সমাধান হয়নি। ওয়াসার দাবি, ১৪ কোটি টাকা দিয়েই শেষ হবে ছোট সড়কের কাজ
খুলনা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক খান সেলিম আহমেদ বলেন, কেসিসিকে আমরা ১১২ কোটি টাকা দিয়েছি। তারা ইতোমধ্যে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এখনও প্রায় ১৪ কোটি টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। এই অর্থ দিয়ে ১৯৫টি ছোট সড়কে কংক্রিট ঢালাই করে এক মাসের মধ্যেই চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব। যদি কেসিসি কাজ না করে, তাহলে টাকা আমাদের ফেরত দিক। আমরা নিজেরাই কাজ করব।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে কেসিসির সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। আশা করছি দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছানো যাবে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, ম্যানহোল বসানোর জন্য ২০ ফুট পর্যন্ত গর্ত খোঁড়া হয়েছে। এতে আশপাশের সড়কও ধসে পড়েছে। অনেক জায়গায় পুরো সড়কই নতুন করে নির্মাণ করতে হচ্ছে। এজন্য ব্যয় অনেক বেড়েছে। সেই কারণেই অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ছোট সড়কগুলো চাইলে ওয়াসা নিজেরাই সংস্কার করতে পারে। তবে বড় সড়ক মেরামতের অভিজ্ঞতা তাদের নেই। সব টাকা ফেরত দিয়ে দিলে বড় সড়কগুলোর সংস্কারও অনিশ্চিত হয়ে যাবে।
নগরীর শেখপাড়া স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার বাসিন্দা আমির সোহেল বলেন, দেড় বছর আগে আমাদের গলিতে পাইপ বসানো হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল দুই মাসের মধ্যে রাস্তা ঠিক হবে। কিন্তু আজও রাস্তা আগের অবস্থায় ফেরেনি। মোটরসাইকেল বাড়ির সামনে আনতে পারি না। অন্যের বাড়িতে রেখে হেঁটে আসতে হয়।
২৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিয়াপাড়া দ্বিতীয় গলির বাসিন্দা আকবর হোসেন বলেন, রিকশা তো দূরের কথা, হেঁটেও চলা যায় না। বৃষ্টি হলে পুরো রাস্তা কাদায় ভরে যায়। শিশু, বৃদ্ধ সবাই কষ্টে আছে।
নগরীর ১৭, ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষাধিক মানুষ প্রতিদিন এমন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অর্ধসমাপ্ত ম্যানহোল, অসমান সড়ক, কংক্রিটবিহীন গর্ত এবং বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে মোটরসাইকেল ও রিকশা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। রাতের বেলায় অনেক স্থানে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না থাকায় পথচারীরাও বিপাকে পড়ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়নকাজের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরও মাসের পর মাস রাস্তা ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে উন্নয়নের সুফল ম্লান হয়ে যায়। খুলনায়ও সেই চিত্রই স্পষ্ট। একদিকে ওয়াসা বলছে, অর্থ দেওয়া হয়েছে; অন্যদিকে কেসিসি বলছে, সেই অর্থ যথেষ্ট নয়। আর এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, কেসিসি ও ওয়াসা দ্রুত মতবিরোধের অবসান ঘটিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেবে। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্য মানুষের জীবনমান উন্নয়ন নতুন করে দুর্ভোগ সৃষ্টি করা নয়।
দুই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জটিলতা যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বাড়বে নাগরিক ভোগান্তি। আর সেই ভোগান্তির দায় শেষ পর্যন্ত কার সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে খুলনাবাসীর মনে।

