
সিরাজুল ইসলাম : বিশ্বের বৃহত্তম লোনাপানির বন সুন্দরবন। এই সুন্দরবনের মধুর সুনাম দেশজুড়ে। খাঁটি মধুর ঘ্রাণ ও স্বাদ অতুলনীয়। মধুপ্রেমীদের কাছে সুন্দরবনের খাঁটি মধুর কদর অন্যরকম। জাতীয় অর্থনীতিতেও সুন্দরবনের মধুর অবদান ব্যাপক। আজ ১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের মৌসুম। তবে বৃষ্টির সঙ্গে সুন্দরবনের মধুর সম্পর্ক রয়েছে বলে জানান একাধিক মৌয়াল। যত বৃষ্টি হয় মৌচাকে তত বেশি মধু পাওয়া যায় বলে জানান তারা।
সুন্দরবনের সংলগ্ন গাবুর ইউনিয়নের মৌয়াল আবু মুছা বলেন, ‘আমি অনেক ছোট বেলা থেকে সুন্দরবনের চাক ভাঙি। যে বছর যত বৃষ্টি হয় সে বছর চাকে তত মধু পাওয়া যায়। এবছর আজ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়নি। পাস নিয়ে বনে গেলে ঠিক মতো মধু পাওয়া যাবে কিনা জানি না। মধু আহরণ করতে গেলে ধোঁয়া করতে হয়, ধুনু পোড়াতে হয়, আর এসবের গন্ধে বাঘ চলে আসে। সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি বাঘের আক্রমণের শিকার হয় মৌয়ালরা। এছাড়া পাগলা মৌমাছি তো আছেই।
বন বিভাগের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ১১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও সুন্দরবনের বিভিন্ন রেঞ্জে পর্যায়ক্রমে মৌয়ালদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত পারমিট নিয়ে দলবদ্ধভাবে তারা গভীর বনে প্রবেশ করে প্রাকৃতিক চাক থেকে মধু সংগ্রহ করবেন। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বনজ সম্পদ রক্ষায় নির্ধারিত নিয়ম মেনে মধু সংগ্রহের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে চাক ধ্বংস বা অতিরিক্ত আহরণ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৮৫৪ দশমিক ৫ কুইন্টাল মধু এবং ২৭৫ দশমিক ৫ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করা হয়েছিল। ওই সময় ২৪৮টি পাশের মাধ্যমে ১হাজার ৭০৯ জন মৌয়াল বনে প্রবেশ করেছিলেন।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এবার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এতে সরকার রাজস্ব আয় পাবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো মৌয়াল পরিবারের জীবিকায় স্বস্তি ফিরবে।
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘ আজ ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণ মৌসুম শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে বন বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উপকূলীয় অঞ্চলে চার হাজারের বেশি পেশাদার মৌয়াল সুন্দরবন থেকে মধু আহরণ করেন। সুন্দরবনে মৌচাক থেকে পর্যাপ্ত মধু আহরণের জন্য মৌয়ালদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারণ উপযুক্ত সময় ছাড়া মৌচাক থেকে পর্যাপ্ত মধু পাওয়া যায় না। তাছাড়া মধু আহরণের সময় যাতে মৌমাছি আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ নজর রাখতে হয়।
সুন্দরবনের চারিদিকে নোনাপানি সে কারণে মৌমাছিদের মিষ্টি পানি দরকার হয়। সেই পানি তারা বৃষ্টি থেকে পেয়ে থাকে। কিন্তু এবছর এখনও বৃষ্টি হয়নি সেজন্য কী হবে বলা যাচ্ছে না।
জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাবে গাছে ফুল ভালো না হলে মধু উৎপাদন ব্যাহত হয়। কারণ ফুলের সঙ্গে মধু উৎপাদনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পরিচর্যা ও সংরক্ষণের ফলে ইদানিং সুন্দরবনে গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে মধু উৎপাদন বৃদ্ধি হবে। সরকারিভাবে মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ করে বিদেশে রফতানির কথা বলেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বেকার সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি আরও চাঙা হবে।
শ্যামনগরে মধু নিয়ে কাজ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ এনভায়ারমেন্ট ডেভলপমেন্ট সোসাইটি। এর পরিচালক মাসুদুর রহমান মুকুল বলেন, প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত সুন্দরবনের মধু উৎকৃষ্ট মানের। কিন্তু উৎপাদিত মধু সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা গেলে বিদেশে অধিক মূল্যে বিক্রি করা যাবে। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে দেশ। তিনি নিউজিল্যান্ডে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ভানুকা মধুর কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মধু। এ মধু প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন অঞ্চলে মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠলে অধিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

