
হাবিবুর রহমান, শ্যামনগর থেকে ফিরে: দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ভোগ-দখলে থাকা চিংড়ি ঘেরের একাংশ দখলে নিয়েছে দোদন্ড প্রতাপশালী শহিদ বাহিনী। প্রতিকার চাওয়ায় ভয়-ভীতিকর হুমকি প্রদর্শণ করছে শহীদ বাহিনীর সদস্যরা। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সীমান্ত নদী রায়মঙ্গলের পাঁচনদীর মোহনায় অবস্থিত কালিঞ্চি গ্রামের পঞ্চানন বৈদ্য ও অরবিন্দু বৈদ্য দীর্ঘ ৫০ বছর যাবৎ ৬ বিঘার একটি মৎস্য ঘের করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। ৫ আগষ্টের পট পরিবর্তনের পর শ্যামনগর উপজেলার তারানিপুর গ্রামের অয়জুদ্দি মোল্লার পুত্র বাবু মোল্লা কালিঞ্চি গ্রামের সংখ্যালঘু পল্লীর বেড়ি বাঁধের স্লোপে দুই রুমের একটি দোকান ঘর বানায় এবং শুরু থেকে সেখানে কাঁকড়ার ব্যবসা করে। বাবু মোল্যার নজর পড়ে পঞ্চানন-অরবিন্দু বৈদ্যের ছোট্ট মৎস্য ঘেরে। বাবু মোল্যার পক্ষে রমজান নগর বিএনপি সভাপতি দোদন্ড প্রতাপশীল শহীদ ও তার ভাই নুরুজ্জামান মাঠে নামে।
তারা পঞ্চানন ও অরবিন্দুর মৎস্য ঘেরে বাবু মোল্যার জমি আছে এবং তা বের করে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ৫ আগষ্টের পর রমজান নগর ইউনিয়নে শহীদ বাহিনী ব্যাপক ত্রাস সৃষ্টি করে চাঁদাবাজী, লুটতরাজ, দখলবাজী করে সাধারন মানুষকে জিম্মি করে ফেলে। এসময় দৈনিক সাতনদী পত্রিকায় সিরিজ প্রতিবেদন ছাপা হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে পঞ্চানন ও অরবিন্দু তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে বিএনপি’র ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কারী বিএনপি নেতা ডঃ মনিরুজ্জামানের বাড়িতে আসে। ডঃ মনিরুজ্জামান তাদেরকে অভয় দিয়ে বলেন, আমরা আপনাদের পাশে আছি তিনি তার ছোট ভাই নুরুজ্জামানের সাথে পঞ্চানন ও অরবিন্দুকে স্থানীয় শ্যামনগর থানায় পাঠান।
টেলিফোনে ন্যায় বিচার করার জন্য অফিসার ইনচার্জকে বলেন। এরই মধ্যে ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি ও তার ভাই নুরুজ্জামান সহ তার বাহিনীকে বাবু মোল্যার পক্ষে কালিঞ্চি গ্রামে পাঠান সংখ্যালঘু পরিবারের মৎস্য ঘের দখলের জন্য। ৯৯৯ এ সংখ্যালঘু পরিবারটি অভিযোগ দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মৎস্য ঘের দখল বন্ধ করে উভয় পক্ষকে থানায় ডাকেন। পঞ্চানন-অরবিন্দু ও বাবু মোল্যা থানায় আসে। অফিসার ইনচার্জ অদৃশ্য কারণে বিষয়টি শালিস করার জন্য চিহ্নিত দখলবাজ শহীদের ওপর দায়িত্ব দেন। শহীদ রায় দেন বাবু মোল্যার পক্ষে। পরে দু’পক্ষ সার্ভেয়ার নিয়ে মাপ জরিপ করেন। কিন্তু মাপ জরিপ করা সার্ভেয়ারদের মতামত গ্রহণ না করেই পঞ্চানন ও অরবিন্দুর ঘেরের একাংশে খুটো মেরে দেয়া হয়। গতকাল শনিবার ১২ এপ্রিল পঞ্চানন-অরবিন্দু চিংড়ি ঘেরের একাংশ দখলে নিয়ে নেয় বাবু মোল্যা।
এদিকে শহিদ ও তার বাহিনীর হুমকির মুখে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছে পঞ্চানন ও অরবিন্দুর পরিবার। তারা থানা পুলিশ সহ সাংবাদিকদের কাছে যেন অভিযোগ না করে সে জন্য বিশেষ বাহিনী মাঠে নামিয়েছে। পঞ্চানন ও অরবিন্দু পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাদের বলা অনেক কথা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। গোপন অনুসন্ধ্যান করে খবরটি বানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে মৎস্য ঘের দখলকারী বাবু মোল্যা সাতনদীকে জানান, আমি প্রশান্তর নিকট থেকে দেড় একর, কার্ত্তিক এর নিকট থেকে দেড় একর, আবু সাঈদ এর নিকট থেকে দেড় একর, হামিদের নিকট থেকে দেড় একর ও জোহরার নিকট থেকে দেড় একর জমি লিজ ডিড নিয়েছি। পঞ্চানন ও অরবিন্দুর ঘেরের মধ্যে থাকা প্রশান্তর দরুন প্রাপ্য ২ বিঘা জমি বের করে নিয়েছি। তিনি এও বলেন, না পেলে জমি ছেড়ে দেব।
এ বিষয়ে অরবিন্দু ও পঞ্চাননের বক্তব্য হচ্ছে ৫০ বছর যাবৎ তারা এই মৎস্য ঘেরটি করে আসছে। তারা আব্দুল্ল্যার নিকট থেকে এক একর, জোহরার নিকট থেকে এক একর এবং তাদের ভগ্নিপতি নিখিলের নিকট থেকে ২ বিঘা জমি লীজ ডিড নিয়েছে। তাদের দখলে থাকা ঘেরের জমির পরিমাণ সাড়ে পাঁচ বিঘা। তারা যোগ করে বলেন, প্রশান্তর জমি তাদের ঘেরের মধ্যে নয় অন্য জায়গায়। তারা এও দাবী করেন কারও জমি তাদের ঘেরে থাকলে সেই জমি হারি দিয়ে লীজ ডিড নেওয়ার অধিকার তাদের বাবু মোল্যার নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনৈক গফ্ফার মেম্বর কার্ত্তিক, আবু সাঈদ ও জোহরার নামে দেড় একর করে সরকারি জমি বন্দোবন্ত নিয়ে অন্যের কাছে হারি দিয়ে সুবিধা ভোগ করে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। বাবু মোল্যা এই গফ্ফার মেম্বারকে বশে এনে নতুন করে লীজ ডিড নিয়েছে কিছু জমির। এর মধ্যে জোহরার জমি পঞ্চানন বৈদ্যের নামে লীজ ডিড থাকলেও বাবু মোল্যা নতুন করে তার নিকট থেকে লীজ ডিড নিয়েছে।
রমজাননগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শহীদ জানান, তিনি কারও মৎস্য ঘের জবর দখলে নেতৃত্ব দেননি। শ্যামনগর থানার ওসি বিষয়টি মিমাংসার জন্য তার ওপর দায়িত্ব দেন মাত্র। এর পর তিনি বিষয়টি মিমাংসা করে দিয়েছেন। বিএনপি নেতা ও সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ডঃ মনিরুজ্জামান সাতনদীকে জানিয়েছেন, পঞ্চানন ও অরবিন্দু তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তার কাছে আসেন। তারা তাদের মৎস্য ঘের নিয়ে সংকটের কথা জানান, বিষয়টি সুরাহার জন্য তিনি শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জকে বলেন। আপন ভাই নুরুজ্জামানকেও তিনি পঞ্চানন-অরবিন্দুর সাথে থানায় পাঠান।
শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ সাতনদীকে জানান, উভয় পক্ষকে তিনি স্থানীয়ভাবে মিমাংসার জন্য পরামর্শ দেন। বিএনপি নেতা শহীদের নিকট তিনি উক্ত বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেননি।

