
মোঃ ইশারাত আলী, কালিগঞ্জ ব্যুরো : গত ৩০ জুন (মঙ্গলবার) বিকেল ৫টায় নিজ বাড়ি থেকে মাছ ধরার ফাঁদ (আটল) বসানোর উদ্দেশ্যে ঘেরে গিয়ে নিখোঁজ হন সঞ্জীব সরকার। পরদিন ভোরে ঠেকরা মৌজায় ২ নং আসামি তাপস সরকার ওরফে ডালিম সরকারের মাছের ঘেরের ক্যানেলের পানি ও ঘাসের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর নিথর মৃতদেহ। শুরু থেকেই পরিবার এটিকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করে এলেও পুলিশি তদন্তের গতি ও আন্তরিকতা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে নিহতের চোখ, ঠোঁট ও গলায় একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে সম্পন্ন হওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের মতামত পুরো ঘটনার সত্যতা উন্মোচন করে দেয়-সঞ্জীবের মৃত্যু পানিতে ডুবে নয়, বরং গলায় লিগেচার মার্কসহ শ্বাসরোধ করে হত্যার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা হয়েছিল। মৃত্যুর আগে তাঁর শরীরে চালানো হয়েছিল নির্মম শারীরিক নির্যাতন।
এত স্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও আইনি ভিত্তি থাকার পরও মামলার তদন্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার। তাদের অভিযোগ, এজাহারে সুনির্দিষ্ট আসামিদের নাম থাকার পরও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে না। দিনের পর দিন চলছে কালক্ষেপণ, যার পেছনে কুচক্রী মহলের সঙ্গে প্রশাসনের আর্থিক লেনদেনের গুঞ্জন দিন দিন জোরালো হয়ে উঠছে।
তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। স্থানীয় এলাকাবাসী ও নিহতের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর জোরালো গুঞ্জনে উঠে আসছে মামলার অন্যতম সাক্ষীর বিরুদ্ধেই অভিযোগ-এই পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতাদের একজন হিসেবে কাজ করছেন খোদ এই মামলার সাক্ষী নিজেই।
প্রশ্ন উঠেছে জোরালোভাবে: যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি বা নেপথ্যে যুক্ত, তাদের নাম এজাহার ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে আসার পরও পুলিশ কেন রহস্যজনকভাবে নীরব? মামলার সাক্ষী নিজেই কি নিজেদের বিরুদ্ধের অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য নেপথ্যে বড় ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছেন-এমন আলোচনা এখন তুঙ্গে গোটা কালিগঞ্জ জুড়ে।
নিহতের বাবা ও মামলার বাদী গোপাল চন্দ্র সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তেও পরিষ্কার হয়ে গেছে যে আমার ছেলেকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। অথচ পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার না করে কালক্ষেপণ করছে। আমরা কার কাছে বিচার পাবো?”
আইনজীবীদের মতে, যেকোনো ফৌজদারি মামলার প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই মামলায় তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা ও গড়িমসি ন্যায়বিচারকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে সাক্ষীদের প্রভাবিত করা বা আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।
এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রহিম বলেন, মামলার ৪ নং আসামি নেপাল সরকারকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে এবং তাকে ১২ জুলাই রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মামলার ১ নং আসামি আনন্দ সরকার, ২ নং আসামি তাপস সরকার ও ৩ নং আসামি শাওন সরকারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান, এবং দ্রুত সব আসামিকে গ্রেপ্তারের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সঞ্জীব সরকার হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত না হলে এর সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো সমাজে। স্থানীয় সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ঠান্ডা মাথার খুন পার পেয়ে গেলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। এতে ভবিষ্যতে এলাকায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং পৈশাচিক সহিংসতার প্রবণতা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন সময় এসেছে সব ধরনের তদবির, প্রলোভন ও প্রশাসনিক শৈথিল্য উপেক্ষা করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার। অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আইনের কঠোর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক- এটাই এখন ঠেকরা রহিমপুরসহ সমগ্র কালিগঞ্জের আপামর জনসাধারণের একমাত্র জোরালো দাবি।

