
তরিকুল ইসলাম,সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউনিয়নের কাশিবাটি গ্রামে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজানা সুলতানার মরদেহ উদ্ধারের সময় তা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েন হত্যা মামলার সাক্ষী হামিদুল ইসলাম (হামিদুল মোড়ল)। তিনি কাশিবাটি গ্রামের এন্তোফ মোড়লের ছেলে এবং ফারজানা হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষীদের একজন বলে জানা গেছে।
হামিদুল ইসলামের দাবি, গত ২০ জুলাই ফারজানা নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি ও স্বজনরা কালিগঞ্জ থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সুমাইয়া খাতুনের ঘরের তালা খুলে পুলিশ ও স্থানীয়রা ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে একটি ওয়ারড্রবের ভেতর ভাঁজ করা অবস্থায় ফারজানার মরদেহ পাওয়া যায়।
হামিদুল ইসলাম বলেন, কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘরে প্রবেশ করেন। ওয়ারড্রবের ভেতরে ফারজানার মরদেহ দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক ঘণ্টা পর তিনি জ্ঞান ফিরে জানতে পারেন, সুমাইয়া খাতুনকে জনতা পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গণপিটুনি দিয়েছে। এরপর যে ঘরে সুমাইয়ার মরদেহ রাখা ছিল, সেখানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর আহ্বান জানান এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে ফারজানার মরদেহ ঘর থেকে বের করা হয়।
হত্যার পেছনে একজোড়া সোনার দুলই কারণ ছিল এবং এ কারণেই সুমাইয়া ফারজানাকে হত্যা করেছে—এমন তথ্য তিনি কীভাবে জানলেন, এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে হামিদুল ইসলাম সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার হওয়া আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রায় চার বছর আগে হামিদুল ইসলামের উদ্যোগে তার বোন সুমাইয়া খাতুনের বিয়ে একই গ্রামের আমিরুল ইসলামের সঙ্গে হয়। বিয়ের পর তারা জানতে পারেন, আমিরুল মাদকাসক্ত ও জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। এ নিয়ে দাম্পত্য কলহ, নির্যাতন এবং একাধিক সালিস বৈঠকের ঘটনা ঘটে।
মামুনের দাবি, একটি সালিস বৈঠকে তাকে কেন্দ্র করে হামিদুল ইসলাম অপমানিত হন। পরে হামিদুল তাকে মারধর করলে উভয় পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তবে ফারজানা সুলতানার পরিবার ও সুমাইয়া খাতুনের পরিবারের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। তারা একে অপরের বাড়িতে যাতায়াত করতেন, রান্না করা খাবার বিনিময় করতেন এবং পারিবারিক লেনদেনও ছিল।
মামুন আরও জানান, ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তিনি ভাগনি আমেনাকে খাবার কিনে দিয়ে বাড়ি ফেরেন। পরে দুপুর সোয়া ১টার দিকে কয়েকজন মোবাইল ফোনে জানতে চান, সুমাইয়া ও ফারজানা তাদের বাড়িতে গেছে কি না।
হামিদুল ইসলামের বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম তার দাবি নাকচ করেন।
তিনি বলেন, “হামিদুল মোড়ল নামে কাউকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। নিহত সুমাইয়া খাতুন ফারজানা হত্যাকাণ্ডে জড়িত—এমন কোনো বক্তব্য তিনি পুলিশকে দেননি। এছাড়া যে ঘরে ফারজানার মরদেহ পাওয়া যায়, সেখানে সুমাইয়ার কাছ থেকে চাবি নিয়ে প্রবেশ করা হয়নি। স্থানীয় লোকজন তালা ভেঙে ঘরে ঢুকেছিলেন। হামিদুল নামে কেউ সেখানে অজ্ঞান হয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।”
ফারজানা সুলতানা হত্যা মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য যাচাই করে দেখছেন। ঘটনার বিষয়ে হামিদুল ইসলাম ও পুলিশের বক্তব্যে অসঙ্গতি থাকায় তদন্তের অগ্রগতির দিকে নজর রয়েছে।

