প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ১০:১০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ৭:৫৬ অপরাহ্ণ

মাসুম বেলাল কাইয়ুম: সুন্দরবনকে আমরা অনেকেই শুধু একটি বন হিসেবে দেখি। সেখানে বাঘ আছে, হরিণ আছে, আছে অসংখ্য গাছপালা, নদী-খাল আর জীববৈচিত্র্য। কিন্তু সুন্দরবনের কাছাকাছি বসবাস করা মানুষের কাছে এর অর্থ আরও অনেক বড়। এই বন তাদের জীবনের অংশ, জীবিকার অংশ এবং দুর্যোগের সময় আশ্রয়ের মতো একটি প্রাকৃতিক ঢাল।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষ বছরের পর বছর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। একদিকে নদীভাঙন, অন্যদিকে লবণাক্ততা। এর মধ্যে আবার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়। বঙ্গোপসাগরে একটি শক্তিশালী নিম্নচাপ তৈরি হলেই উপকূলের মানুষের মনে উদ্বেগ শুরু হয়। বাঁধ টিকবে তো? ঘরবাড়ি থাকবে তো? জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকবে না তো?
আইলা, আম্পান, ইয়াসসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মানুষের জীবনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কোথাও ঘরবাড়ি ভেঙেছে, কোথাও বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি ঢুকেছে, আবার কোথাও মাছের ঘের ও ফসল নষ্ট হয়েছে। এসব দুর্যোগের অভিজ্ঞতা থেকে উপকূলের মানুষ বুঝতে শিখেছেন, সুন্দরবন তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ মোস্তাক হোসেন, পিতা নুর ইসলাম গাজী। তাঁর সঙ্গে কথা বললে সুন্দরবন নিয়ে স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ও নির্ভরতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। তাঁর মতে, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সুরক্ষা। বনের ওপর আঘাত যত বাড়বে, উপকূলের মানুষের ঝুঁকিও তত বাড়বে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ রবিউল ইসলাম, পিতা অহেদ গাজী। তাঁর চোখেও সুন্দরবন শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়। এই বনের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে। সুন্দরবনের নদী-খাল ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভর করে বহু পরিবার তাদের সংসার চালায়। তাই বন রক্ষা মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, মানুষের জীবন-জীবিকাও রক্ষা করা।
সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড়কে থামিয়ে দিতে পারে না-এটা ঠিক। কিন্তু বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন ঝড়ের বাতাস, ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের শক্তি কমাতে প্রাকৃতিকভাবে ভূমিকা রাখে। এ কারণেই উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুন্দরবনের গুরুত্ব এত বেশি। মানুষের তৈরি বাঁধ বা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কিন্তু একটি সুস্থ ও বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন দুর্যোগের সময় প্রকৃতির নিজস্ব প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।
সুন্দরবনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু দুর্যোগের সময়ের নয়। এই বনের ওপর নির্ভর করে বহু মানুষ মাছ, কাঁকড়া, মধু, গোলপাতাসহ বিভিন্ন সম্পদ সংগ্রহ করেন। কেউ নদীতে মাছ ধরেন, কেউ কাঁকড়া আহরণ করেন, আবার মৌসুমে কেউ মধু সংগ্রহের জন্য বনে যান। এসব মানুষের কাছে সুন্দরবন একটি জীবন্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
তবে এই নির্ভরতার জায়গাটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ বনের সম্পদ ব্যবহার করবে, কিন্তু সেই ব্যবহার যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে একসময় বনই দুর্বল হয়ে পড়বে। আবার বন রক্ষার নামে বননির্ভর মানুষের জীবিকার পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেও সমস্যা তৈরি হবে। তাই প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষও বাঁচবে, বনও বাঁচবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সুন্দরবনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। লবণাক্ততা বাড়ছে, নদীভাঙন হচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে। উপকূলের মানুষের জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। একদিকে কৃষিজমিতে লবণাক্ততা, অন্যদিকে সুপেয় পানির সংকট। ফলে সুন্দরবন রক্ষা শুধু বন বিভাগের একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি পুরো উপকূল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
সুন্দরবনের নদী-খালগুলোর কথাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে উপকূলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোথাও নদী ভরাট হয়, কোথাও ভাঙন বাড়ে। ফলে সুন্দরবন, নদী, বাঁধ এবং মানুষের বসতি-এসবকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও equally গুরুত্বপূর্ণ। রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের সবচেয়ে পরিচিত প্রাণী হলেও এই বনের গুরুত্ব শুধু বাঘের কারণে নয়। হরিণ, কুমির, বানর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, মাছ ও অসংখ্য উদ্ভিদ-সব মিলেই সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র। একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব অন্য অংশেও পড়তে পারে।
তাই সুন্দরবন রক্ষায় শুধু বন্যপ্রাণী রক্ষার কথা বললে হবে না। বনজ সম্পদ আহরণে নিয়ম মানতে হবে, নিষিদ্ধ সময়ে বনে প্রবেশ ও আহরণ বন্ধ রাখতে হবে, দূষণ কমাতে হবে এবং অবৈধ শিকার ও সম্পদ আহরণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনেরও সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পর্যটনের নামে যদি বনের পরিবেশ নষ্ট হয়, তাহলে সেই পর্যটনই একসময় সুন্দরবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই পর্যটন হতে হবে পরিবেশবান্ধব এবং নিয়ন্ত্রিত।
আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনাতেও সুন্দরবনকে গুরুত্ব দিতে হবে। উপকূলে রাস্তা হবে, বাঁধ হবে, ঘরবাড়ি হবে, শিল্প ও পর্যটনের বিকাশ হবে—সবই প্রয়োজন। কিন্তু কোনো উন্নয়ন যেন সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও নদীর প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, সুন্দরবনকে শুধু দুর্যোগের সময় মনে করলে চলবে না। ঝড় এলে আমরা বুঝতে পারি বনের প্রয়োজন। কিন্তু ঝড় চলে গেলে যদি আবার বনকে ভুলে যাই, তাহলে ভবিষ্যতের দুর্যোগ আরও কঠিন হতে পারে।
আজকের সুন্দরবন শুধু আমাদের প্রজন্মের সম্পদ নয়। আগামী প্রজন্মেরও এই বনের ওপর অধিকার আছে। তারা যেন বইয়ের ছবিতে নয়, বাস্তবেই একটি জীবন্ত সুন্দরবন দেখতে পারে-সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের।
উপকূলের মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাদের নিরাপত্তার জন্য বাঁধ দরকার, আশ্রয়কেন্দ্র দরকার, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা দরকার। কিন্তু এর পাশাপাশি দরকার একটি শক্তিশালী সুন্দরবন। কারণ প্রকৃতির তৈরি এই প্রাকৃতিক ঢালের কোনো কৃত্রিম বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়।
সুন্দরবন আমাদের কাছ থেকে সম্পদ নেয়, আবার আমাদের অনেক কিছু ফিরিয়েও দেয়। আমরা তার নদী থেকে মাছ নিই, বন থেকে মধু ও অন্যান্য সম্পদ সংগ্রহ করি। আর দুর্যোগের সময় সেই বনই উপকূলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। এই সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা তাই আমাদের দায়িত্ব।
সুন্দরবনকে বাঁচানো মানে শুধু বাঘ-হরিণকে বাঁচানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী, জীববৈচিত্র্য, বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের নিরাপত্তা।
প্রশ্নটা তাই শুধু ‘সুন্দরবন কীভাবে বাঁচবে’-এটা নয়। প্রশ্ন হলো, সুন্দরবনকে আমরা বাঁচাতে না পারলে উপকূলের মানুষ কতটা নিরাপদ থাকবে?
উত্তরটি খুব কঠিন নয়। সুন্দরবন দুর্বল হলে উপকূলের ঝুঁকি বাড়বে। আর সুন্দরবন শক্তিশালী থাকলে উপকূলও প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি বাড়তি শক্তি পাবে।
তাই এখনই সময় সুন্দরবনকে নতুন করে দেখার। বনকে শুধু সম্পদের উৎস হিসেবে নয়, মানুষের নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বন রক্ষা করতে হবে। কারণ সুন্দরবন আর উপকূল-দুটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে জীববৈচিত্র্য, বাঁচবে মানুষের জীবন-জীবিকা। আর সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে আমাদের উপকূল।