নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমি, নদ-নদী, খাল-বিল, জলাভূমি, কৃষিজমি এবং নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর সমাহারে সমৃদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ জেলার শ্যামনগর উপজেলায় অবস্থিত।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের অনন্য আধার হলেও নানা পরিবেশগত সংকটে ক্রমেই বদলে যাচ্ছে সাতক্ষীরার প্রকৃতি। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, নদী-খাল দখল, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, বৃক্ষনিধন এবং জলাশয় ভরাটের কারণে জেলার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, বন্যপ্রাণী এবং মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর।
সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবন। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুরসহ উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর, বানর, কুমির, উদবিড়ালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, পাখি ও জলজ প্রাণী। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া, পশুরসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ এ বনের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে। সুন্দরবন শুধু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল বাতাসের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পাশাপাশি বনজ সম্পদ, মাছ, মধু ও কাঁকড়া আহরণের মাধ্যমে বহু মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবেও কাজ করছে। সাতক্ষীরার প্রকৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে ইছামতী, কপোতাক্ষ, বেতনা, মরিচ্চাপ ও খোলপেটুয়াসহ বিভিন্ন নদ-নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একসময় এসব নদীতে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ছিল। নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষিকাজ, নৌযান চলাচল ও মৎস্য আহরণ ছিল স্থানীয় মানুষের জীবনের অংশ।
কিন্তু বর্তমানে অনেক নদী ও খাল পলি জমে ভরাট, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত বাঁধ, দূষণ এবং পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার মতো সমস্যায় পড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সাতক্ষীরার ইছামতী, কপোতাক্ষ ও বেতনা নদীর ৩০২ জন অবৈধ দখলদার শনাক্তের তথ্য উঠে এসেছে। নদীর জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, কৃষিজমি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। সাতক্ষীরা শহরের প্রাণসায়ের খালও দীর্ঘদিন ধরে দখল ও দূষণের সমস্যায় আক্রান্ত। খালটি বেতনা ও মরিচ্চাপ নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় শহরের পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এর গুরুত্ব অনেক। সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা এখন বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ।
শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও দেবহাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাটি ও পানির লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদন এবং সুপেয় পানির প্রাপ্যতাকে প্রভাবিত করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কৃষি বিভাগের তথ্যের বরাতে জানানো হয়, সাতক্ষীরার প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। এর মধ্যে চিংড়ি চাষের জমিও রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ছে। মিঠাপানির পুকুর ও জলাশয়ের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সাতক্ষীরার অন্যতম বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি, নদীর নাব্যতা সংকট, খাল ভরাট, অপরিকল্পিত মাছের ঘের এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে টানা বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে ২০ জুলাই সকাল পর্যন্ত জেলায় ৪৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। ওই সময় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর আউশ ধান ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার তথ্য জানায় কৃষি বিভাগ।
অন্যদিকে আশাশুনি ও শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন এবং বেড়িবাঁধের ঝুঁকি উপকূলীয় জনপদের জন্য বড় হুমকি হয়ে রয়েছে। বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করলে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, পুকুর ও মৎস্যঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুন্দরবনের বাইরেও সাতক্ষীরার গ্রামীণ পরিবেশে রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী ও দেশীয় জলজ প্রাণী। পুকুর, বিল, খাল, ধানক্ষেত ও গাছপালা এসব প্রাণীর আবাসস্থল। কিন্তু জলাশয় ভরাট, নির্বিচারে গাছ কাটা, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার কারণে এসব প্রাণীর অস্তিত্ব ও স্বাভাবিক বিচরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাখি, মাছ, ব্যাঙ, সরীসৃপ ও অন্যান্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উপকূলীয় জেলা হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সাতক্ষীরায় বিশেষভাবে অনুভূত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও লবণাক্ততা এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত বাসসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাতক্ষীরার প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বিশেষ করে কৃষক, জেলে, দিনমজুর ও উপকূলীয় এলাকার নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে সুপেয় পানির উৎস সংরক্ষণ, লবণসহিষ্ণু কৃষি, টেকসই বেড়িবাঁধ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। সাতক্ষীরার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ জন্য— সুন্দরবনের বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নজরদারি বাড়াতে হবে। ইছামতী, কপোতাক্ষ, বেতনা, মরিচ্চাপ ও খোলপেটুয়াসহ সব নদী-খাল দখলমুক্ত করতে হবে। প্রাণসায়ের খালসহ শহর ও গ্রামের জলাশয় দূষণমুক্ত ও সচল রাখতে হবে।
অপরিকল্পিত চিংড়ি ঘেরের কারণে কৃষিজমি ও মিঠাপানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বন্ধ করতে হবে। দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র, পাখির আবাসস্থল ও জলাভূমি সংরক্ষণ করতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় পরিকল্পিত বনায়ন ও সামাজিক বনায়ন বাড়াতে হবে। প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই বেড়িবাঁধ ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সাতক্ষীরার প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এ জেলার মানুষের খাদ্য, অর্থনীতি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। সুন্দরবন, নদ-নদী, খাল-বিল, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা না গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো জনপদের ওপর। পরিবেশ সংরক্ষণে প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি ও মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে। উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ক্ষতি নয়, বরং প্রকৃতিকে রক্ষা করেই উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
কারণ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে নিরাপদ থাকবে সাতক্ষীরার পরিবেশ, সুরক্ষিত হবে মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকে থাকবে এই জনপদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।