জি,এম নজরুল ইসলাম শ্যামনগরঃ
সুন্দরবন—প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়, জীববৈচিত্র্যের আধার, আর দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রাণ।
কিন্তু এই জীবন্ত বন আজ নিঃশব্দে কাঁদছে।
কারণ, অভয়ারণ্যের নিষিদ্ধ নদী-খালে চলছে অবাধে মাছ ও কাঁকড়া শিকার,
আর এর পেছনে সক্রিয় একটি শক্তিশালী দালাল চক্র।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও,
অভয়ারণ্যের গভীরে বিষ ছিটিয়ে মাছ ধরার মতো নৃশংস পদ্ধতিও এখন সাধারণ ঘটনা।
এই অপরাধের ছায়া পড়ে শুধু প্রকৃতির ওপর নয়,
বরং সমাজের নৈতিকতাকেও করে তোলে প্রশ্নবিদ্ধ।
তদন্তে উঠে এসেছে,
বনের নিষিদ্ধ জলপথগুলো অঘোষিত ইজারা হিসেবে তুলে দেওয়া হচ্ছে জেলেদের হাতে,
যেখানে কথিত চুক্তির আড়ালে চলে ঘুষের লেনদেন।
এই চক্রে শুধু বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মীই নয়,
জড়িত রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, দালাল, দাদনদাতা মাছ ব্যবসায়ী ও তথাকথিত মহাজনেরা।
শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জের হরিনগর এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী নিজেই স্বীকার করেছেন,
তিনি বন বিভাগের নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে ঘুষের বিনিময়ে অনুমতিপত্র (পাস) সংগ্রহ করে
জেলেদের অভয়ারণ্যে পাঠান মাছ ও কাঁকড়া ধরতে।
তাঁর ভাষায়, বাড়তি কিছু খরচ হয় ঠিকই, কিন্তু অল্প সময়ে বেশি মাছ পাওয়া যায়।
মাছ ধরেই সেই খরচ উঠে আসে।
তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে,
চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বন বিভাগের কর্মীরা
সম্প্রতি ইউসুফ আলীর চারটি কাঁকড়ার নৌকার একটি জব্দ করে।
অভিযোগ অনুযায়ী,
কদমতলা স্টেশনের ক্যাশিয়ার তপন কুমার ও স্টেশন কর্মকর্তা সুলতান আহমেদের বরাত দিয়ে
প্রথমে চুক্তি করে টাকা নেওয়া হয়,
পরে সেই চুক্তি অস্বীকার করে অভিযান চালিয়ে নৌকা জব্দ করা হয়।
জব্দ হওয়া নৌকার জেলেরা পালিয়ে গেলে
তাদের পরিবার পড়েছে চরম দুশ্চিন্তায়।
তারা জানায়, বন বিভাগের শর্ত মেনেই তারা কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন,
কিন্তু হঠাৎ অভিযান চালিয়ে নৌকা জব্দ করায়
তাদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং স্বজনদের খোঁজ না মেলায় উদ্বেগ বেড়েছে।
অন্যদিকে, বন বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে জানানো হয়েছে,
অভয়ারণ্যে শিকার বন্ধে নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে,
এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন জেলেকে আটকও করা হয়েছে।
চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে
ক্যাশিয়ার তপন কুমার প্রথমে অস্বীকার করেন,
কিন্তু ফোন রেকর্ডের কথা জানানো হলে
তিনি মন্তব্য না করে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।
স্টেশন কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বলেন,
বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানাবো, আপাতত একটু বন্ধ রাখুন।
এ বিষয়ে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত সহকারী বন সংরক্ষক ফজলুল হক বলেন,
বনের আইন সবার জন্য সমান। সাধারণ জেলে হোক বা প্রভাবশালী—অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন,
যদি কোনো বনকর্মীর বিরুদ্ধে ঘুষ নিয়ে শিকারের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ থাকে,
জেলেরা সরাসরি আমাদের জানাক, আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।
সুন্দরবনের শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে
এই দালাল-দাদন-দুর্নীতির চক্রকে ভেঙে ফেলা এখন সময়ের দাবি।
প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের জন্য
এই অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া জরুরি—
না হলে হারিয়ে যাবে জীবনের উৎস,
আর নিঃশব্দে নিঃশেষ হবে সুন্দরবনের প্রাণ।