জি , এম নজরুল ইসলাম শ্যামনগরঃ
প্রকৃতির অপার বিস্ময় সুন্দরবন—যেখানে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিনিয়ত কাজ করছে সরকার।
কিন্তু সেই সুন্দরবনের প্রবেশপথেই যেন পাতা হয়েছে ঘুষের এক অদৃশ্য জাল,
যার নেপথ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট দালাল ও কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা।
স্থানীয় জেলে ও বাওয়ালীদের অভিযোগ,
পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের তিন কর্মকর্তা—রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ ফজলুল হক,
রেঞ্জ সহকারী এ.বি.এম হাবিবুল ইসলাম এবং বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান—
দীর্ঘদিন ধরে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী,
সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে প্রবেশের অনুমতি, পাস নবায়ন,
এমনকি মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য নির্ধারিত সরকারি ফি’র বাইরে
প্রতিটি নৌকার জন্য অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
সাংবাদিকদের হাতে আসা একাধিক কল রেকর্ডে
দালালদের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন,
এই চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করছেন
রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ ফজলুল হক নিজেই,
যার ছত্রছায়ায় চলছে এই অবৈধ অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশন—
বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী ও কোবাতক—
এর মধ্যে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনকে সবচেয়ে প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
জেলেদের দাবি, এখান থেকেই নির্ধারিত হয়
অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের নির্দিষ্ট রেট,
যা অন্যান্য স্টেশনেও অনুসরণ করা হয়।
তাদের ভাষায়—
সরকারি নিয়ম মানতে আমরা প্রস্তুত,
কিন্তু ঘুষ না দিলে সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ নেই।
পাস নেওয়া থেকে শুরু করে মাছ-কাঁকড়া বিক্রি পর্যন্ত
প্রতিটি ধাপে দিতে হয় অবৈধ অর্থ।
অথচ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়
২০২১ সালের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে রাজস্ব হার নির্ধারণ করেছে—
চিংড়ি প্রতি কুইন্টাল ৫০০ টাকা,
কাঁকড়া ৭৫০ টাকা,
সাদা মাছ ৬৪০ টাকা,
রূপচাঁদা, ভেটকি, পাঙ্গাস ২,৪০০ টাকা,
এবং নৌকা থেকে মাছ ধরার জন্য জনপ্রতি ১৫ টাকা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
জেলেরা জানিয়েছেন,
কাঁকড়ার পাসে মাথাপিছু ৩৯০ টাকা,
চরপাটা পাসে ৩৯০ টাকা,
আর ফাঁস জালের পাসে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়,
যা সরকারি নির্ধারিত ফি’র বহু গুণ বেশি।
২০১৯ সালে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় কাঁকড়া পরিবহনের অনুমতি না পেয়ে
জাহান আলী গাজীসহ আটজন নৌকা মালিক হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।
২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়—
নৌকা প্রবেশের আগে দিনে তল্লাশি, বেআইনি সরঞ্জাম নিষিদ্ধ,
এবং হ্যান্ডবিল ও পোস্টার সরবরাহ বাধ্যতামূলক।
কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি,
এই নির্দেশনাগুলো উপেক্ষিত এবং
স্টেশনগুলোতে চলছে স্বেচ্ছাচারিতা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সংস্কৃতি।
জেলেরা আরও জানান,
হাবিবুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমান নিজেদের
এসিএফ ফজলুল হকের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে
জেলেদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে
বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন,
আমাদের অফিসে আসেন, আমরা রাজস্ব ছাড়া টাকা নিই না।
রিসিট ছাড়া কোনো টাকা গ্রহণ করি না।
অপরদিকে রেঞ্জ সহকারী হাবিবুল ইসলাম বলেন,
আমি রাজস্ব খাতে নেই, এসিএফ সাহেব ভালো বলতে পারবেন।
তবে নিয়ম সবসময় মানা হয় না।
রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ ফজলুল হক-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও
তিনি ফোন রিসিভ করেননি।