কিশোর কুমার: সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে বছরজুড়েই অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান পরিচালিত হলেও শহরের প্রাণকেন্দ্র বড় বাজারের চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজারের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ফুটপাত পর্যন্ত মহেন্দ্র, ইজিবাইক, ইঞ্জিনচালিত ভ্যান এবং ব্যবসায়ীদের পণ্য সামগ্রীতে দখল হয়ে আছে। নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন চলাচল, যত্রতত্র পার্কিং ও সড়ক দখলের কারণে প্রতিদিন চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতা, পথচারী ও ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডে-নাইট কলেজ এলাকা থেকে বড় বাজারের কাঁচাবাজারে প্রবেশের মুখেই সড়কের ওপর কয়েকটি ভ্যান ও ইঞ্জিনচালিত ভ্যানে মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ চলছে। বাজারের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, ফুটপাতের বড় একটি অংশ দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন অনেকে। কারও কারও নিজস্ব দোকান থাকলেও অতিরিক্ত মুনাফার আশায় দোকানের সামনের সড়ক ও ফুটপাত জুড়ে পণ্যসামগ্রী সাজিয়ে ব্যবসা করছেন। ফলে পথচারীদের চলাচলের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
আরও সামনে মুদিদোকান এলাকায় দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভ্যান, ইজিবাইক ও ইঞ্জিনচালিত ভ্যান। এতে সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মাছবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একাধিক ইঞ্জিনচালিত ভ্যান সড়কের ওপর দাঁড় করিয়ে মাছ বিক্রি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাজারের ভেতরে স্বাভাবিক চলাচলের পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে বড় বাজারের প্রবেশপথে রাস্তার প্রায় অর্ধেক দখল করে সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মহেন্দ্র ও ইজিবাইক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বেসিক ব্যাংকের সামনের অংশ থেকে বড় বাজারের প্রবেশমুখ পর্যন্ত এসব যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। অনেক সময় বাজারে প্রবেশের মুখেই ভ্যান ইজি বাইক থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ, প্রতিদিন বাইরে থেকে অনেক অপরিচিত ভ্যান, ইজিবাইক ও ইঞ্জিনচালিত যানবাহন বাজারে প্রবেশ করে। বাজারের অভ্যন্তরীণ চলাচলের নিয়ম সম্পর্কে তাদের ধারণা না থাকায় এবং যেখানে-সেখানে যানবাহন দাঁড় করানোর কারণে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। তবে বাজারের ভেতরে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
বাজারে আসা ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম বলেন, আমি নিয়মিত এ বাজার থেকে কেনাকাটা করি কিন্তু সকাল ১০টার পর বাজারে প্রবেশ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ইজিবাইক, ভ্যান, ইঞ্জিনভ্যান ও ভটভটিতে বাজারের রাস্তা এমনভাবে দখল হয়ে থাকে যে প্রবেশ করা এবং বের হওয়া রীতিমতো যুদ্ধের মতো। অথচ এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে তিনি অভিযোগ করেন। স্থানীয় আব্দুর রহিম, আমিনুল ইসলাম ও মমিনুল ইসলামসহ কয়েকজন ক্রেতা যানজট ও ফুটপাত দখলের কারণে ভোগান্তির কথা জানান। তাঁদের মতে, পাইকারি ও খুচরা পণ্য কিনতে এসে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয় তাদের । অনেক সময় স্বল্প দূরত্ব অতিক্রম করতেও অতিরিক্ত সময় লেগে যাচ্ছে যার ফলে বাজারে স্বাভাবিক কেনাকাটার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়া, সাতক্ষীরা বড় বাজারে বর্তমানে মুদিব্যবসায়ী সমিতি, মাছ ব্যবসায়ী সমিতি ও কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতি নামে তিনটি সংগঠন রয়েছে। কিন্তু এতগুলো সংগঠন থাকার পরও বাজারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
সূত্র জানায়, সাতক্ষীরা বড় বাজার জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে পাইকারি ও খুচরা দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যায়। ফলে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে আসেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের যানজট, অবৈধ পার্কিং এবং ব্যবসায়ীদের ফুটপাত ও সড়ক দখলের কারণে তাঁদের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রওশন আলী বলেন, বাজারে প্রচণ্ড যানজট হয়। আমরা সব সময় এগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। আমাদের অনেক সদস্য রয়েছেন। তাঁদের নিয়ে বাজারের শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতে যাতে যানজট সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানান তিনি।
সাতক্ষীরা পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ লিয়াকত আলী বলেন, ইতোমধ্যে যারা ফুটপাত দখল করে রেখেছেন, তাদের ৫ থেকে ৭ বার ফুটপাত থেকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা পুনরায় আবারো ফুটপাত দখল করে বসছেন। বিষয়টি নিয়ে বড় বাজারের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে ফুটপাত দখলমুক্ত করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে যানজট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে শহরের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চললেও সাতক্ষীরা বড় বাজারের প্রবেশপথ ও অভ্যন্তরীণ সড়কের দীর্ঘদিনের এই সমস্যা কেন সমাধান হচ্ছে না? এর পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের প্রভাব রয়েছে কি না, তা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, ট্রাফিক পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট বাজার সমিতির প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁদের দাবি, বাজারের প্রবেশপথ ও অভ্যন্তরীণ সড়ক দখলমুক্ত করা, ব্যবসায়ীদের ফুটপাত ও সড়কে পণ্যসামগ্রী রাখা বন্ধ করা, নির্দিষ্ট স্থানে যানবাহন দাঁড়ানোর ব্যবস্থা, মালামাল ওঠানো-নামানোর সময় ও স্থান নির্ধারণ এবং ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।