বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরা জাতীয় অর্থনীতিতে অনন্য অবদান রেখে চলেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন এবং মৎস্য সম্পদের বড় অংশ কেন্দ্র করে এই জেলার অবস্থান। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য জেলার সার্বিক অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। সাতক্ষীরার সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে প্রধান
অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতগুলোর চিত্র তুলে ধরা হলো:ডিজিটালাইজেশন ও শেড বৃদ্ধি: ভোমরা স্থলবন্দরের আধুনিকায়ন ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ভোমরা স্থলবন্দর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান গেটওয়ে।
অটোমেটেড ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম ও ডিজিটালাইজড ট্র্যাকিং চালুর মাধ্যমে দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করা জরুরি। অতিরিক্ত গুদাম ও শেড নির্মাণ করলে খোলা আকাশের নিচে পচনশীল পণ্য নষ্ট হওয়া রোধ করা সম্ভব।পাসপোর্ট যাত্রী সুবিধা ও বাইপাস সড়ক: আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য আধুনিক টার্মিনাল ভবন নির্মাণ এবং বন্দর এলাকা থেকে ভারী ট্রাক শহরের বাইরে পাঠানোর জন্য ডেডিকেটেড ‘বাইপাস রোড’ নির্মাণ করা প্রয়োজন।
নতুন রেলপথ স্থাপন: রেললাইন সংযোগ প্রতিষ্ঠা অবকাঠামোগত যোগাযোগের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো রেললাইন। যশোর বা খুলনা থেকে সাতক্ষীরা হয়ে ভোমরা স্থলবন্দর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি।
অর্থনৈতিক লাভ: এই সংযোগ স্থাপিত হলে ভারতীয় আমদানিকৃত কাঁচামাল ও সাতক্ষীরার চিংড়ি খুব কম খরচে সারা দেশে পরিবহন করা যাবে।প্রধান মহাসড়ক প্রশস্তকরণ: যশোর-সাতক্ষীরা এবং খুলনা-সাতক্ষীরা সড়ককে চার লেনে উন্নীত করা আঞ্চলিক যোগাযোগের অন্যতম মূল দাবি।উপকূলীয় বাঁধ ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট: শ্যামনগর ও আশাশুনির মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকার পাকা রাস্তাগুলো বন্যা ও প্লাবনসহনশীল টেকসই কনক্রিট দিয়ে পুনঃনির্মাণ প্রয়োজন।
জলবায়ু সহনশীল বাঁধ:বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সুরক্ষা ও টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থা সাতক্ষীরা সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার।
নদী ভাঙন ও ঘূর্ণিঝড় থেকে সুন্দরবনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে আধুনিক ও স্থায়ী সি-ওয়াল (Sea-wall) বা টেকসই ভেড়িবাঁধ নির্মাণ করা।পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম: প্লাস্টিক দূষণ রোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করে সুন্দরবন রক্ষা করা এবং শ্যামনগর কেন্দ্রিক টেকসই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা।ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণ:প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে জরাজীর্ণ বিদ্যালয়গুলোর সংস্কার এবং পর্যাপ্ত আধুনিক শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা দরকার।দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র বিশিষ্ট স্কুল: উপকূলীয় অঞ্চলে বিদ্যালয় ভবনগুলোকে বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার হিসেবে গড়ে তোলার অবকাঠামোগত নকশা প্রয়োগ করা জরুরি।
কারিগরি শিক্ষা: স্থানীয় যুবক-যুবতীদের দক্ষ কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট ও আইসিটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যকরতা: আইসিইউ, সিসিইউ এবং জরুরি বিভাগে প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধি করা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্যাটেলাইট ক্লিনিক: প্রত্যন্ত অঞ্চল বিশেষ করে শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিয়াগঞ্জের মানুষকে চিকিৎসা সেবা পৌঁছাতে ইউনিয়ন ভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা উন্নত করা।
লবণাক্ততার বিকল্প সুপেয় পানীয় জল ব্যবস্থা: স্বাস্থ্য রক্ষায় সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সরকারি বড় মাপের মেগা রিভার্স অসমোসিস (RO) ওয়াটার প্ল্যান্ট স্থাপন করা জরুরি।
সুপারিশ ও উপসংহার: সাতক্ষীরার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।ভোমরা স্থলবন্দর আধুনিকায়ন, রেললাইন সংযোগ, সুন্দরবন সুরক্ষা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে সাতক্ষীরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থসামাজিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে। সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে এসব অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পে জরুরি ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
লেখক- মো. মাসুদ রানা এমএসসি (পদার্থ বিজ্ঞান) সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ।