মোঃ মোকাররাম বিল্লাহ ইমন সাতক্ষীরাঃ সাতক্ষীরা জেলার দীর্ঘদিনের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা নিরসন, নদী-খাল দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধার এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক নাগরিক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১ আগস্ট) সাতক্ষীরা শহরের পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে এ সভার আয়োজন করা হয়।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আয়োজনে এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সহযোগিতায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিবেশকর্মী, নদী ও পানি বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, শিক্ষক, কৃষক প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় বক্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদী-খালের নাব্যতা সংকট, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে সাতক্ষীরায় জলাবদ্ধতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। এর ফলে স্থানীয় কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, প্রাকৃতিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, টিআরএম (Tidal River Management)-এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং টেকসই নদী ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সভা থেকে জেলার জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিবেশ রক্ষায় ১০ দফা নাগরিক সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। সীমানা নির্ধারণ ও মানচিত্র: জেলার সকল নদী ও খালের সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ এবং আধুনিক ডিজিটাল মানচিত্র প্রণয়ন করা। দখল উচ্ছেদ: অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা। পুনঃখনন ও বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ: নদী-খাল পুনঃখননের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালুকরণ। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন: পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছাড়া বড় কোনো অবকাঠামো নির্মাণ না করা। জনসম্পৃক্ততা ও পর্যবেক্ষণ: নদী ও খাল সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং প্রতি বছর নাগরিক পর্যবেক্ষণ সভার আয়োজন করা।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহবায়ক এ্যাডঃ আজাদ হোসেন বেলালের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সদস্য সচিব আলীনুর খান বাবুলের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, সাবেক অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ, প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবুল কাশেম, সাবেক সভাপতি মমতাজ আহমেদ বাপ্পী, ‘দৈনিক দক্ষিনের মশাল’-এর প্রকাশক ও সম্পাদক অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী, কবি ও লেখক কিশোরী মোহন সরকার, দুদকের আইনজীবী এ্যাড. আসাদুজ্জামান দুলু, মানবাধিকার কর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত, বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহাফুজুর রহমান মুকুল এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এছাড়া জলাবদ্ধতায় কবলিত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ফিংড়ী, বাঁকাল, ইটাগাছা ও কামালনগরের সাধারণ বাসিন্দারাও সভায় তাঁদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন।
সভা শেষে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোতে পেশ করার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে একটি ‘সাতক্ষীরা নাগরিক সুপারিশপত্র’ প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আয়োজকরা জানান, "নদী বাঁচলে সাতক্ষীরা বাঁচবে, জলপ্রবাহ ফিরলে জলাবদ্ধতা কমবে"—এই রূপকল্পকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।