
জি,এম নজরুল ইসলাম শ্যামনগরঃ
উপকূলীয় জনপদের মানুষের জীবনসংগ্রাম, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও অভিযোজন কৌশল তুলে ধরতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে স্থানীয় অভিযোজন মেলা ও জলবায়ু সংলাপ।
সোমবার (৯ মার্চ) উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট পাইকের মোড় বিলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর যৌথ উদ্যোগে এ ব্যতিক্রমধর্মী মেলার আয়োজন করা হয়। প্রকৃতি, মানুষ ও জীবিকার পারস্পরিক সম্পর্ককে সামনে রেখে আয়োজিত এই মেলা উপকূলীয় জীবনের বাস্তবতা ও সংগ্রামের এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে।
মেলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ১৩টি স্টলের মাধ্যমে উপকূল অঞ্চলের জীবন-জীবিকা, স্থানীয় জ্ঞান, ঐতিহ্য ও অভিযোজন কৌশলের নানা দিক উপস্থাপন করেন। এসব স্টলে প্রদর্শিত হয় উপকূলীয় কৃষি যন্ত্র ও আগাছা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, হাওর ও উপকূলের মাছ ধরার উপকরণ, স্থানীয় অভিযোজন চর্চা, বিলুপ্তপ্রায় সামগ্রী, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্য উপকরণ, বনজীবীদের জীবনধারণের সামগ্রী, পরিবেশবান্ধব চুলা, স্থানীয় জাতের বীজ, ধান ও চালের বৈচিত্র্য, হস্তশিল্প ও মাটির তৈজসপত্র।
এছাড়া শুকনা খাবার, হাতে আঁকা চিত্রের মাধ্যমে উপকূলীয় সংকট, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্পর্কেও সচেতনতা তুলে ধরা হয়। সাংস্কৃতিক আয়োজনের অংশ হিসেবে জারি-সারি গান পরিবেশন, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং দেয়ালিকা প্রদর্শন মেলায় ভিন্নমাত্রা যোগ করে। এতে স্থানীয় জনগণ, শিক্ষার্থী, নারী সংগঠক, যুবসমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন গ্রীণ কোয়ালিশনের সভাপতি এম. জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম।
উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বারসিকের পরিচালক ও প্রাণবৈচিত্র্য গবেষক পাভেল পার্থ। এছাড়া বক্তব্য রাখেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস. এম. দেলোয়ার হোসেন, বারসিকের সহযোগী আঞ্চলিক সমন্বয়কারী রামকৃষ্ণ জোয়ারদার, শংকর ম্রং, শ্যামনগর গ্রীণ কোয়ালিশনের সভাপতি কৃষ্ণানন্দ মুখার্জী, সদস্য রণজিৎ বর্মন, নেত্রকোনার আল্পনা নাফাক, কামনা হাজং, বনজীবী শেফালী বিবি এবং যুব স্বেচ্ছাসেবক সাইদুল ইসলামসহ অন্যান্যরা।
বক্তারা বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে যদি জাতীয় নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে টেকসই জলবায়ু অভিযোজন নিশ্চিত করা সম্ভব। এ ধরনের আয়োজন স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সামনে এনে নীতি-নির্ধারক ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তারা আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূল ও হাওর অঞ্চল ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবুও প্রতিকূলতার মধ্যেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী দেশীয় বীজ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং নিজস্ব অভিযোজন কৌশলের মাধ্যমে টিকে থাকার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজন যথাযথ জলবায়ু অর্থায়ন। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সরাসরি গ্রামের মানুষের হাতে জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে অভিযোজন উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের এই অভিযোজন সংগ্রামকে জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করে সবার জন্য জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।