প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ৭:২৪ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ

#পূজার সুরক্ষায় ‘ঘুষের ছড়াছড়ি’, কর্তাদের পকেট ভারী!
মোহাম্মদ মুজাহিদ: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গাপূজায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন এবং তাঁর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ডিউটিতে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে জনপ্রতি ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, টাকা না দেওয়ায় তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় একাধিক ভুক্তভোগী বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ৭১টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২৬ সালের ১৫ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত আট দিনের জন্য আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়। উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৭১টি পূজামণ্ডপের মধ্যে এবার ১টি মণ্ডপে পূজা উৎযাপন হয়নি। সেকারণে ৭০টি পূজা মণ্ডপে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য অনলাইনে আবেদন করেন ১ হাজার ৭০০ জন। তাঁদের মধ্য থেকে ৪৫০ জনকে নির্বাচিত করে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনলাইনে আবেদন করেও দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের অর্থ লেনদেনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। কয়েকজনের দাবি, ইউনিয়ন দলনেতা বা টিম লিডারের মাধ্যমে তাঁদের কাছে টাকা চাওয়া হয়। আবার কেউ কেউ উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
৩৪ সদস্যের কাছ থেকে ২৬ হাজার ৯০০ টাকা সংগ্রহের অভিযোগ
রমজাননগর ইউনিয়ন আনসার ও ভিডিপি দলপতি মো. রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, তাঁর এলাকার ৩৪ জন সদস্যকে দুর্গাপূজার নিরাপত্তার দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুনের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাঁকে জানানো হয়, শুধু অনলাইনে আবেদন করলেই দায়িত্ব পাওয়া নিশ্চিত নয়; এ জন্য টাকা দিতে হবে।
রুহুল আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তিনি ৩৪ জন সদস্যের কাছ থেকে মোট ২৬ হাজার ৯০০ টাকা সংগ্রহ করেন। এরপর উপজেলা কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে টাকা দিতে চাইলে তাঁকে সহকারী ট্রেইনার ইনস্ট্রাক্টর (টিআই) আলমগীর হোসেনের কাছে টাকা জমা দিতে বলা হয় বলে তিনি দাবি করেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আলমগীর হোসেনের কাছে টাকা দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তিনি।
রুহুল আমিন আরও দাবি করেন, নিজের ছেলের ডিউটির বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁকেও টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, অর্থ দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচন করা হয়।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে রুহুল আমিনসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের দলনেতারা ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
টাকা না দেওয়ায় ডিউটি না পাওয়ার অভিযোগ
অস্ত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভিডিপি (সশস্ত্র) সদস্য শেখ মনিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পাওয়ার জন্য তাঁর কাছে এক ইউনিয়ন টিম লিডার ১ হাজার টাকা দাবি করেন। তিনি টাকা না দিয়ে অনলাইনে আবেদন করেন।
মনিরুলের দাবি, বিষয়টি উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কার্যালয়ের সহকারী ট্রেইনার ইনস্ট্রাক্টর (টিআই) আলমগীর হোসেনকে জানালে তাঁকে বলা হয়, টাকা ছাড়া ডিউটি হবে না। পরে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মনিরুল আরও দাবি করেন, বিষয়টি উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুনকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। বরং ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং ভবিষ্যতে আর কোনো ডিউটি দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হয়।
এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে মনিরুল ২২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাহিনীর মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
একাধিক সদস্যের একই ধরনের অভিযোগ
শ্যামনগর উপজেলার চিংড়িখালী গ্রামের আনিচ হোসেন, কৃষ্ণপদ জোয়ারদার, যাদবপুর গ্রামের মুকুল হোসেন, সোনাখালী গ্রামের আশরাফুল এবং ভৈরবনগর গ্রামের ইসরাফিল হোসেনসহ আরও কয়েকজন সদস্য একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
তাঁদের দাবি, দুর্গাপূজার নিরাপত্তার দায়িত্ব পেতে অনলাইনে আবেদন করার পর ইউনিয়ন দলনেতার মাধ্যমে জনপ্রতি ১ হাজার টাকা করে চাওয়া হয়। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
অন্যদিকে, সোনাখালী গ্রামের ইউনুস আলী ও একই গ্রামের সবুজ মণ্ডলের কাছ থেকেও ডিউটি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ১ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন মনিরুল ইসলাম।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে প্রকৃত যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যরা বঞ্চিত হতে পারেন। এতে বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁরা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সারাদেশে ২ লাখ ১২ হাজারের বেশি আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন
২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গাপূজায় সারা দেশে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় মোট ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েনের তথ্য দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পুরুষ সদস্য ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৮৮ জন এবং নারী সদস্য ৬৬ হাজার ৩৩০ জন।
বাহিনীর কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণ পূজামণ্ডপে ছয়জন এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ পূজামণ্ডপে আটজন করে সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তা কার্যক্রমে ‘শারদীয় সুরক্ষা’ অ্যাপ ব্যবহারের কথাও জানা গেছে।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কার্যক্রমে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অনলাইনে আবেদনকারীদের মধ্য থেকে কীভাবে চূড়ান্ত নির্বাচন করা হয়েছে, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী ট্রেইনার ইনস্ট্রাক্টর (টিআই) আলমগীর হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন।”
অন্যদিকে, উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুনের সঙ্গে সরাসরি আলাপকালে শারদীয় দুর্গা পূজায় নিরাপত্তায় আনসার ও ভিডিপি ডিউটি বন্টন ও নির্বাচন করার ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকা ঘুষ বানিজ্যের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা ও জেলা কমান্ড্যান্ট মো. ইবনুল হক মুঠোফোনে বলেন, “আর্থিক লেনদেন করার কোনো সুযোগ নেই। ডিউটি বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্নীতি প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে, আনসার সদস্যদের ডিউটি বন্টনে ঘুষ বানিজ্যের সাথে জড়িত উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন ও তার সহযোগী (টিআই) আলমগীর হোসেন এর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।