
হাবিবুর রহমান: স্বর্ণের বার ছিনতাইয়ের খবর প্রকাশের পর যুবদল নেতা সুমনের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর সব অপরাধ চিত্র সামনে এসেছে। খাটালেরগরুর টাকা ছিনতাই, মাদক ব্যবসায় সিদ্ধ হস্ত বিগত দিনে তাতী লীগের ব্যানারে থাকা সুমন এখন যুবদলের মস্তবড় নেতা। খবর প্রকাশের জেরে সুমন সাতনদী সম্পাদককে হত্যার হুমকি দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৪ আগষ্ট দুপুরে শহর থেকে ১২টার দিকে ১০ পিচ স্বর্ণের বার নিয়ে ভোমরা স্থলবন্দর অভিমুখে যাচ্ছিল জনৈক যুবক। পথিমধ্যে মেডিকেল কলেজ ও বাইপাসের সংযোগ স্থানে পৌছালে আগে থেকে ওৎপেতে থাকা যুবদল নেতা সুমন স্বর্ণের বার বহনকারী যুবককে ধাওয়া দেয়। একটি লাল রং এর নম্বর প্লেট বিহীন গাড়ীতে সুমন ও রাজু স্বর্ণের বার বহনকারী যুবকের পিছু নেয়। স্বর্ণের বার বহনকারী যুবক যশোর অভিমুখে বাইপাস সড়ক দিয়ে দ্রুত গতিতে চলতে থাকে। এক পর্যায়ে ২ কিলোমিটার দূরে গিয়ে আবু সাঈদের তেলের পাম্পের সামনে গিয়ে সুমন স্বর্ণের বার বহনকারী যুবকে ধরে ফেলে। ধ্বস্তাধ্বস্তির এক পর্যায়ে যুবকের নিকট থেকে ১০ পিচ স্বর্ণের বার ছিনতাই করে নেয় সুমন ও তার সহযোগী। ধ্বস্তা-ধ্বস্তির সময় আশ-পাশের লোক জড়ো হতে থাকে ঘটনাস্থলে। মুহুর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে শহরে। শতাধিক লোক ঘটনাস্থলে হাজির হলে বাঁধে শোর-গোল। দুটি যুবককে বেদম মারপিটের ভিডিও চিত্রও সাতনদীর হাতে এসেছে। সেখানে সাদা ক্যাপ পরিহিত অবস্থায় সুমনকে দেখা যায়। ঘটনাস্থল থেকে ট্রিপল নাইনে ফোন দিলে ইটাগাছা পুলিশ ফাঁড়ির এস আই আলমগীর কবির ঘটনাস্থলে পৌছান। তখন ঘড়ির কাটা ১২.৩০ মিনিট। থানায় ফিরে এস আই আলমগীর কবির ৪১৪ নম্বর একটি ডাইরি করেন। ডাইরিতে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ২টি মোটর সাইকেল উদ্ধারের ঘটনা বর্ণনা করা হয়।

স্বর্ণেরবার পাচার কাজে ব্যাবহৃত মোটর সাইকেল
এর মধ্যে সুমনের মালিকানাধীন নম্বর প্লেট বিহীন এবং একটি হিরো হোন্ডা স্পেলেন্ডার ১০০ সিসি মটর সাইকেল যার রেজিঃ নং সাতক্ষীরা-হ-১৭-৭৮১১।

স্বর্ণেরবার ছিনতাইয়ে ব্যাবহৃত পুলিশকর্তৃক জব্দকৃত সুমনের মোটরসাইকেল
জিডিতে ঘটনাস্থল আবু সাইদের পেট্রোল পাম্পের নিকটবর্তী বাইপাস সড়কের ওপর দেখানো হলেও ভিডিও চিত্রে দেখা যায় রাফসান পেট্রোল পাম্পের ধারে বাইপাস সড়কের নিচে জমিতে শতাধিক লোক হট্টগোল করছে। চলছে সংঘর্ষ। শোনা যাচ্ছে একজন বলছে ওর কাছে মাল আছে। প্রকৃত ঘটনা হলো স্বর্ণের বার ছিনতায়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে সুমনের পক্ষের এবং বিপক্ষের লোকও ছিল। স্থানীয়দের হাতে গণধোলাইয়ের শিকার হয় সুমনের সহযোগী রাজু। ট্রিপল নাইনে ফোন দিয়ে পুলিশ ডাকায় স্বর্ণের বারসহ সুমন সটকে পড়ে ঘটনাস্থল থেকে। ইতোমধ্যে আদালতের মাধ্যমে সুমন তার নিজের গাড়ী এবং স্বর্ণের বার বহনকারী যুবকের রেখে যাওয়া স্পেলেন্ডার মটর সাইকেল ফেরত পেতে যাচ্ছে। পুলিশ স্বর্ণের বার ছিনতাইয়ের কোন অভিযোগ না পেলেও উদ্ধার করা মোটর সাইকেল নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আইও এস আই আলমগীর কবির জানান, বিষয়টি এসপি স্যার এমনকি ডিআইজি স্যারও জানেন।

বাইপাস সড়কে স্বর্নেরবার ছিনতাই কালে সাদা টুপি মাথায় যুবদল নেতা সুমন
এদিকে স্বর্ণের বার খোয়ানো ব্যক্তি শাসকদলের শীর্ষ নেতার স্মরণাপন্ন হলে বিষয়টি নিয়ে শালিসী বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে ২ জন প্রভাবশালী নেতা উপস্থিত ছিলেন। এক পর্যায়ে ১০ পিস স্বর্ণের বার থেকে ৪ পিস ফেরত দেয়া হয়। ৬ পিস থেকে যায় সুমনের কাছে যার বাজার মূল্য ৭৫ লক্ষ টাকা। এ ঘটনা গতকাল ২৮ সেপ্টেম্বর দৈনিক সাতনদীর প্রিন্ট ভার্সনে ছাপা হয়। সেখানে তথ্যগত কিছু ভুল ছিল। ঘটনাস্থল পুরাতন সাতক্ষীরা বলা হয়। তবে ২৭ সেপ্টেম্বর দিনগত রাত সাড়ে দশটায় সাতনদীর ওয়ানলাইন নিউজ পোর্টালে খবরটি ছোট আকারে ছাপা হয় যা ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে।
২৭ সেপ্টেম্বর ওয়ানলাইনে খবর প্রকাশ পেলে সুমন তার ব্যবহৃত মোবাইল ০১৭১৬-১৮১২৫৭ নং ফোন থেকে রাত ১০.৫০ মিনিটে সাতনদী সম্পাদক ও প্রকাশক হাবিবুর রহমানকে ফোন করে হত্যার হুমকি সহ গালিগালাজ করে। তাৎক্ষনিকভাবে হাবিবুর রহমান ঘটনাটি জেলা বিএনপি ও জেলা যুবদলের শীর্ষ নেতাদের অবহিত করেন। যুবদল নেতা সুনের পরিচয় : আদি বাড়ী ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়নের নূনগোলা ও বর্তমানে সদর উপজেলার পুরাতন সাতক্ষীরা পশ্চিম পাড়ার সুজাউদ্দীন সরদারের পুত্র মোঃ সুমন রহমান। তিনি বর্তমানে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক। নিজেকে সুমন যুব দলের সাধারণ সম্পাদক বলেও দাবী করেন।
সুমন বিগত সময়ে তাতিলীগের নেতা আলমগীরের ছায়া সঙ্গী ছিল। তাতী লীগের ব্যানার থেকে তৎকালীন সময়ে সার্কিট হাউজবকচরা রোড থেকে সীমান্তের খাটালের গরুর টাকার ব্যাগ ছিনতাই করতো বলে অভিযোগ আছে। তবে সাতনদী যাচাইকরে দালিলিক ডকুমেন্ট হাতে পায়নি। ওই সময়ে মামলা না হওয়ায় দালিলিক প্রমাণ নাই। নিউমার্কেট অঞ্চলের প্রয়াত যুবদল নেতা জাহাঙ্গীর এর কর্মচারী ছিল সুমন। মাদক ব্যবসায়ী সুমন: শুধু ছিনতাই, চাঁদাবাজীতে সিদ্ধ হস্ত নয়। সুমন একসময় মাদক ব্যবসাও করতো। ২০১১ সালের ৮ আগষ্ট সাতক্ষীরা সদর থানায় ১৪৫ বোতল ফেন্সিডিল বহনের দায়ে সুমনের বিরুদ্ধে সদর থানায় একটি মামলা হয় (যার নং-৮৯, তারিখ-২৪/০৮/২০১১)। মামলার বাদী ছিলেন তৎকালীন ডিবির এসআই হারান।

ফেনসিডিল বহন, সুমনের নামে সদর থানায় মামলা
সুমন থেকে হরি সুমন: বহু বছর আগে সুমন আশাশুনির বুধহাটা থেকে একটি শুয়োর চুরি করে আনে। চুরি করে আনা শুয়োরটি রাখা হয় পুরাতন সাতক্ষীরার তৎকালীন সময়ে নির্মানাধীন শিশু সদনের ভবনের এক রুমে। পরে এক হাজার টাকা নিয়ে শুয়োরটি ফেরত দেয়। সুমন বর্তমানে বেতনা নদীর পাড়ে থাকা মাটি ও বালু বিক্রি করছে বিনা বাধায়। সরকারি মাটি বালু বিক্রিকে কেন্দ্র বেতনা নদীর পাড়ে বসবাসরত এক নারীকেও বেধড়ক পিটিয়ে জখম করার গুরুত্বর অভিযোগ আছে। ৫ আগষ্টের পর গণহারে চাঁদাবাজি করার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
যুবদলের নেতা বনে যাওয়া সুমন: বিগত সময়ে তাতীলীগের ব্যানারে থাকা সুমন ৫ আগষ্টের পর যুবদলে আশ্রয় পায়। তথ্য আছে চাঁদাবাজির বিপুল পরিমাণ অর্থকড়ি খরচ করে নেতা বনে গেছে সুমন। জেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতার সুদৃষ্টিতে থাকার গুরুতর অভিযোগও আছে। বিগত দিনে তাতীলীগের ব্যানারে থাকা সুমন যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ায় বিষ্ময় প্রকাশ করেছে খোদ শাসক দলের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।