প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১১:৩০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ৯:০০ অপরাহ্ণ
মে দিবস: শিকাগো থেকে ঢাকা- শ্রমের মর্যাদা ও আগামীর লড়াই
![]()
পূর্ণ চন্দ্র মণ্ডল:ইতিহাসের পাতায় মে মাস মানেই অধিকার আদায়ের রক্তঝরা সংগ্রামের স্মৃতি। ১৮৮৬ সালের পহেলা মে শিকাগোর হে মার্কেটের রাজপথে যে বাদুদ জ্বলে উঠেছিল, তা আজও নিভে যায়নি। বরং সময়ের পরিক্রমায় সেই সংগ্রামের ভাষা বদলেছে, পাল্টেছে দাবি আর আন্দোলনের ধরন। আজ ১৪০ বছর পরও মে দিবস কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মেহনতী মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক অবিনাশী ইশতেহার। রক্তাক্ত ইতিহাস ও আট ঘণ্টার স্বপ্ন: শিল্পবিপ্লবের সূচনালগ্নে শ্রমিকের জীবন ছিল দাসের চেয়েও অধম। প্রতিদিন ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি আর নামমাত্র মজুরিতে শ্রমিকের প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই শিকাগোর শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল অতি সাধারণ- ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং ৮ ঘণ্টা বিনোদন। পহেলা মে শুরু হওয়া সেই আন্দোলনে ৪ মে হে মার্কেটে পুলিশের গুলিবর্ষণে অনেক শ্রমিক শহীদ হন। অগাস্ট স্পাইজসহ আটজন শ্রমিক নেতাকে বিচারের নামে ফাঁসি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই রক্ত বৃথা যায়নি। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে পহেলা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: পুঁজি বনাম শ্রম বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় পুঁজিবাদের রূপ বদলেছে। এখনকার শ্রমিক শোষণ অনেক সময় দৃশ্যমান নয়, বরং পরোক্ষ। আধুনিক বিশ্বে 'গিগ ইকোনমি' বা ফ্রিল্যান্সিং শ্রমের ব্যাপকতা বাড়লেও তাদের সামাজিক নিরাপত্তা আজও নিশ্চিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-র হিসাব অনুযায়ী, আজও বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ জবরদস্তিমূলক শ্রম বা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন কৃষিশ্রমিক ও নির্মাণ শ্রমিকরা। তীব্র তাপদাহের কারণে অনেক দেশে শ্রমঘণ্টা পুনর্নির্ধারণের দাবি উঠছে, যা মে দিবসের আদি দাবিরই একটি নতুন রূপ। বাংলাদেশের অর্জন ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হল কৃষি, পোশাক শিল্প এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। দেশের মোট জিডিপিতে শ্রমজীবী মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭২ সালে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পহেলা মে-কে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেন এবং সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। গত কয়েক দশকে আমাদের শ্রম পরিবেশের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। বিশেষ করে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পোশাক কারখানার নিরাপত্তায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। তবে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আজও প্রকট: ১. মুজুরি ও মুদ্রাস্ফীতি: দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিয়ে শ্রমিকদের প্রকৃত বাড়ছে না। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ২. অপ্রতিষ্ঠানিক খাত: বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সিংহভাগই অপ্রতিষ্ঠানিক। গৃহকর্মী, রিকশাচালক বা দিনমজুরদের জন্য আজও কোন কার্যকর বিমা বা পেনশনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ৩. প্রযুক্তিগত ঝুঁকি: চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বা অটোমেশনের কারণে দক্ষ শ্রমিকের কদর বাড়লেও অদক্ষ শ্রমিকরা কাজ হারানোর ঝুঁকিতে আছেন। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও আগামীর প্রস্তুতি: ভবিষ্যতের মে দিবস হবে প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার লড়াই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আর রোবোটিক্স যখন কায়িক শ্রমের বিকল্প হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন আমাদের বিশাল জনশক্তি কে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা ছাড়া উপায় নেই। শ্রমের মর্যাদা মানে কেবল মজুরি বৃদ্ধি নয়, বরং শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং তার সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
শিকাগোর সেই রক্তঝরা রাজপথ থেকে আজকের ডিজিটাল বিপ্লব- প্রতিটি মোডে শ্রমিকের ঘাম আর মেধা জড়িয়ে আছে। মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্কই পারে একটি দেশকে সমৃদ্ধির নিয়ে যেতে। মে দিবসের এই লগ্নে আমাদের অঙ্গীকার হোক- একজন শ্রমিকও যেন অনিরাপদ পরিবেশে কাজ না করেন। এবং তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত না হন। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধের সেই শাশ্বত দর্শন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত হোক। "শ্রমের মর্যাদা যেখানে ভূুণ্ঠিত, সভ্যতা সেখানে পঙ্গু।" জয় হোক মেহনতি মানুষের, জয় হোক মানবতার।
https://satnadee.com/