নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলার অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত কেবিএস প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে আগামী ৩০ জুন ২০২৬। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং নির্মাণসামগ্রীর তীব্র অভাবের মুখে পড়েছেন ঠিকাদাররা। ফলে তিন জেলার কয়েক লাখ মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি কাটছেই না।
অথচ প্রকল্পের আওতায় এখনও শতাধিক সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট ও অন্যান্য উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কয়েকটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজ শুরুর পর থেকেই দফায় দফায় বাধার মুখে চলমান স্কিমগুলো । স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ প্রকল্প পরিচালকের স্বেচ্ছাচারিতা ও একক সিদ্ধান্তের কারণে জটিল হয়ে উঠেছে পুরো পরিস্থিতি।
এদিকে ঠিকাদারদের দাবি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের কারণে ভারী যন্ত্রপাতি চালানো এবং নির্মাণসামগ্রী পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বালু সংকট। বিশেষ করে সাতক্ষীরার দেবহাটা এলাকায় বালুর অভাবে সড়ক ও সেতুর কাজ প্রায় বন্ধ। নদী থেকে বালু উত্তোলনে বিধিনিষেধ থাকায় সময়মতো উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে না।
একজন ঠিকাদার আক্ষেপ করে বলেন, “জ্বালানি খরচ আর বালুর সংকটে এখন কাজের চার ভাগের এক ভাগ শেষ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকসানের আশঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালে কেবিএস প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় এক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। সেই বর্ধিত মেয়াদও শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, তিন জেলায় এখনও অসংখ্য স্কিমের কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প পরিচালক প্রকৃত তথ্য গোপন করে পরিকল্পনা কমিশন ও পিএসসি সভায় মাত্র ১৬টি চলমান প্রকল্পের তথ্য উপস্থাপন করেছেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব প্রকল্প জুন মাসের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাস্তবে তিন জেলায় প্রায় শতাধিক স্কিম এখনও চলমান রয়েছে।
খুলনা নির্বাহী প্রকৌশলী প্রধান প্রকৌশলী (অনুলিপি প্রকল্প পরিচালক) বরাবর পাঠানো এক পত্রে জানিয়েছেন, তার জেলার অন্তত ১৩টি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। একইভাবে সাতক্ষীরা নির্বাহী প্রকৌশলী তার জেলার প্রায় অর্ধশতাধিক চলমান স্কিমের প্রোগ্রেস রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। বাগেরহাট নির্বাহী প্রকৌশলীও অনুরূপ প্রতিবেদন দিয়েছেন।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীদের এসব বাস্তবভিত্তিক রিপোর্টকে উপেক্ষা করে প্রকল্প পরিচালক নিজস্ব সিদ্ধান্তে মাত্র ১৬টি প্রকল্পের তথ্য পিএসসি সভায় উত্থাপন করেছেন। এতে প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, প্রকল্প পরিচালক প্রায় সব সিদ্ধান্ত এককভাবে নিচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, নির্বাহী প্রকৌশলীদের মতামত কিংবা জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তার এই স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ বাড়ছে। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও যদি প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে একদিকে যেমন জনদুর্ভোগ বাড়বে, অন্যদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অনেক এলাকায় সড়ক খনন করে কাজ শুরু করা হলেও তা এখনও শেষ হয়নি। কোথাও ব্রিজের কাজ অসম্পূর্ণ, কোথাও কালভার্ট নির্মাণ অর্ধেক অবস্থায় পড়ে আছে। বর্ষা মৌসুমের আগে এসব কাজ শেষ না হলে যোগাযোগব্যবস্থা ভয়াবহভাবে ব্যাহত হবে।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মাদ ইজ্জত উল্ল্যাহ প্রধান প্রকৌশলী বরাবর একটি আধা-সরকারি (ডিও) পত্র দিয়েছেন। সেখানে তিনি চলমান স্কিমগুলো বাস্তবায়নের স্বার্থে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই ধরনের পত্র দিয়েছেন খুলনা-৪,সাতক্ষীরা-৩, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্যও।
তারা সকলে উল্লেখ করেছেন, প্রকল্পের আওতায় চলমান কাজগুলো অসম্পূর্ণ রেখে প্রকল্প সমাপ্ত করা হলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।
প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্যদের পাঠানো পত্র প্রধান প্রকৌশলী পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক এসব সুপারিশকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তেই অনড় রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্প পরিচালক শুরু থেকেই মেয়াদ বৃদ্ধি না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, প্রকৌশলীদের মতামত এবং জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশও তিনি উপেক্ষা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও তার মধ্যে ২০ কোটি টাকা প্রকল্প পরিচালকের নিজ জেলা কুষ্টিয়ার একটি প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, চলমান স্কিমগুলো শেষ করার জন্য অর্থ সংকট থাকলেও অন্য জেলায় অর্থ স্থানান্তর করায় উন্নয়ন কার্যক্রম আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
চলমান স্কিমের কয়েকজন ঠিকাদার (ক্ষতির আশংকায়) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বিল উত্তোলন, কাজের অনুমোদন এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে তারা আতঙ্কে রয়েছেন।
একজন ঠিকাদার বলেন, “আমরা কাজ করতে ভয় পাচ্ছি। সময় খুব কম, অথচ অনেক কাজ বাকি। কাজ শেষ না হলেও বিল নিতে গেলে জরিমানার ভয় দেখানো হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে গেলেই নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়।”
আরেকজন ঠিকাদার বলেন, “অনেক জায়গায় কাজের গতি বাড়াতে অতিরিক্ত শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত অল্প সময়ে মানসম্মতভাবে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়।”
সাতক্ষীরা নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল হাসান বলেন, “প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। এ নিয়ে প্রকল্প পরিচালক চাপ দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো, আমাদের জেলায় এখনও অনেক স্কিমের কাজ চলমান রয়েছে। মেয়াদ বৃদ্ধি না হলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।”
খুলনা নির্বাহী প্রকৌশলীও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “অনেক প্রকল্পের কাজ এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাকি রয়েছে। বাস্তবতা বিবেচনায় সময় না বাড়ালে কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।”
বাগেরহাটের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, তাদের জেলায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ এখনও চলমান রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো শেষ করা কঠিন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, “আমি এখানে থাকতে চাই না। প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।" প্রকল্পে অনিয়ম, তথ্য গোপন এবং চলমান স্কিমের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।
জনপ্রতিনিধি ও বিশ্লষেকদের ভাষ্যমতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনার ঘাটতি, সমন্বয়হীনতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা থাকলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। শেষ করে চলমান অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষি ও যোগাযোগব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে চলমান স্কিমগুলো শেষ করার সুযোগ দেওয়া উচিত। অন্যথায় সরকারের বিনিয়োগ যেমন অপচয়ের ঝুঁকিতে পড়বে, তেমনি উন্নয়ন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষ।
এ অবস্থায় স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা দ্রুত প্রকল্পের বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সময় বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে এবং চলমান উন্নয়ন কাজগুলো সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করবে।