
অনলাইন ডেস্ক: সরকার গঠনের এক মাস পূর্ণ হওয়ার পরপরই মন্ত্রিসভার সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জানা গেছে, দায়িত্ব পালনে কোনও ধরনের স্থবিরতা, গাফিলতি বা জনবিচ্ছিন্নতা বরদাস্ত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। এরই অংশ হিসেবে রবিবার (২৯ মার্চ) আকস্মিকভাবে সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী, যা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে।
মূল্যায়নের বহুমুখী পদ্ধতি
সচিবালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রীদের দক্ষতা মাপতে প্রধানমন্ত্রী কেবল দাফতরিক রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছেন না। তিনি নিজস্ব উপদেষ্টা, দক্ষ আমলা এবং বিশেষ কৌশলে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করছেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং টিভি ফুটেজও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা আগামী ১৮০ দিন বা ছয় মাস ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে। একে জবাবদিহি নিশ্চিতের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্যে বিরক্তি
সূত্র জানিয়েছে, গত এক মাসে সরকারের একাধিক মন্ত্রীর অপ্রাসঙ্গিক ও বিতর্কিত মন্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিব্রত। বিশেষ করে নিজের মন্ত্রণালয় ছেড়ে অন্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে মন্তব্য করা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীদের কাজে সমন্বয়হীনতা দেখে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। সরকারকে আরও গতিশীল করতে তিনি এখন ‘এক মন্ত্রীর হাতে একটি মন্ত্রণালয়’ নীতি অনুসরণের কথা ভাবছেন।
রদবদল ও দায়িত্ব বণ্টন
ইতোমধ্যে এই প্রক্রিয়ার প্রতিফলন দেখা গেছে। গত ২৫ মার্চ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তিনটি মন্ত্রণায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের হাত থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব সরিয়ে তা জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীকে দেওয়া হয়েছে।
গুঞ্জন রয়েছে, বড় ও একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম (সড়ক, সেতু, রেল ও নৌ), আব্দুল মুক্তাদির (বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট), আরিফুল হক (শ্রম ও কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান), আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন (সমাজকল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক) এবং ফকির মাহবুব আনামদের (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি) দায়িত্ব কমিয়ে নতুন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
তৃণমূলের খবর নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন উপসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী মাঝেমধ্যেই নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের কাছে বাজারের অবস্থা, গ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের ধারণা সম্পর্কে জানতে চান। গত ২৪ মার্চ ঈদের ছুটি শেষে অফিস খোলার দিনেও তিনি কর্মচারীদের কাছে সরাসরি এসব বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার দফতরে কর্মরত সহকারী স্টাফ মো. হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, ঈদ এবং স্বাধীনতা দিবসের দীর্ঘ ছুটি শেষে রবিবার (২৯ মার্চ) নিজের দফতরে না গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে তিনি মূলত কর্মচারীদের উপস্থিতি নয়, মন্ত্রী ও সচিবরা ঠিকমতো অফিসে এসেছেন কিনা—সে বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন। তার মতে, এর মধ্য দিয়েই হয়তো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাজের মূল্যায়ন করছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষজ্ঞ ও সংসদ সদস্যদের অভিমত
এ প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়া বলেন, “মন্ত্রিপরিষদে রদবদল বা কাজের তদারকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই অংশ। প্রধানমন্ত্রী সরকারের অভিভাবক হিসেবে সবার কাজের ওপর নজর রাখবেন—এটাই স্বাভাবিক।”
পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, “পুরো সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতার দায়ভার প্রধানমন্ত্রীর ওপরই বর্তায়। তাই পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে দায়িত্ব রদবদল করা তার রুটিন কাজেরই অংশ।”
উল্লেখ্য, বর্তমানে ৪৮ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন, উপমন্ত্রী নেই একজনও। এর মধ্যে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী তিন জন। আর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রয়েছেন ১০ জন। এর মধ্যে পাঁচ জন মন্ত্রী পদমর্যাদার এবং পাঁচ জন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার। সরকারের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনে মন্ত্রিসভা আরও সম্প্রসারণ কিংবা উপদেষ্টার সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।