প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ৪, ২০২৬, ৯:৪৪ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ৪, ২০২৬, ৯:১৮ অপরাহ্ণ

শেখ মোস্তফা কামাল, কেশবপুর থেকে: সকাল হলেই বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে আসে শিশুরা। কিন্তু তাদের অপেক্ষায় থাকে না কোনো শ্রেণিকক্ষ। কারও ঠাঁই হয় গাছের ছায়ায়, কেউ বসে ফুটপাতে, আবার কখনো অন্যের ভবনের বারান্দাই হয়ে ওঠে অস্থায়ী পাঠশালা। আকাশে মেঘ জমলে শুরু হয় আরেক দুশ্চিন্তা—বৃষ্টি নামার আগেই বই-খাতা নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবে তারা?
এভাবেই চলছে যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান।
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত মধু পল্লির ভেতরে অবস্থিত বিদ্যালয়টির ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০২৫ সালের জুনে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ২৭১ শিক্ষার্থীর জন্য স্থায়ী শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা হয়নি। আটজন শিক্ষককে নিয়ে খোলা আকাশের নিচেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম।
তীব্র রোদে গাছের নিচে বসে ক্লাস করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টি এলে ভেস্তে যাচ্ছে পাঠদান। কখনো পলিথিন টাঙিয়ে, কখনো আশপাশের কোনো ভবনের বারান্দায় কোনোমতে ক্লাস চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বিদ্যালয়ে উপস্থিতির ওপরও পড়ছে প্রভাব।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিনী রানী দাস বলে, “গাছের নিচে ক্লাস করলে রোদের তাপে খুব গরম লাগে, মাথা ধরে যায়। বৃষ্টি হলে বই-খাতা ভিজে যায়। অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে বসে পড়াশোনা করে। আমাদেরও নিরাপদ একটি ক্লাসরুম দরকার।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মেহেরুন্নেসা বলেন, ভবন পরিত্যক্ত হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পাঠদান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিশুদের বসানো যায় না। তাই বাধ্য হয়ে গাছের নিচে, ফুটপাতে কিংবা অন্য ভবনের বারান্দায় ক্লাস নিতে হচ্ছে। রোদ-বৃষ্টিতে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ হচ্ছে। অনেক সময় উপস্থিতিও কমে যায়। দ্রুত অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”
কেশবপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিদ্যালয়ের ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রাক্কলন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
।।বিদ্যালয়ের অবস্থান
নিয়েও জটিলতা।।
ভবন সংকটের পাশাপাশি সাগরদাঁড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে রয়েছে আরেকটি প্রশ্ন। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত মধু পল্লির গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকার ভেতরে বিদ্যালয়টির অবস্থান হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি পর্যটন ও প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনাতেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রতিদিন মধু পল্লিতে দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকে। বিভিন্ন আয়োজন ও পর্যটন কার্যক্রমের মধ্যেই বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের যেমন বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তেমনি ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ ও পর্যটন এলাকার পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিয়েও জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, মধু পল্লির ভেতরে বিদ্যালয়টি থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সমস্যা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। শিশুরাও ঠিকমতো খেলাধুলা করতে পারছে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যালয়টির সংকটের সমাধান শুধু নতুন ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী একটি জায়গা নির্ধারণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
একদিকে ২৭১ শিশুর নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ, অন্যদিকে মহাকবি মধুসূদনের স্মৃতিবিজড়িত মধু পল্লির ঐতিহাসিক গুরুত্ব—দুই বিষয়কে সমন্বয় করেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি স্থানীয়দের। বিদ্যালয় নির্মাণ বা স্থানান্তর, যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, তার দ্রুত বাস্তবায়ন চান শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।